x 
Empty Product
Wednesday, 27 January 2021 17:27

বারোমাসি আম বাগান

Written by

অনেকদিন ধরেই বাসায় আটকে আছি করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে। বাইরে তেমন একটা যাওয়া হচ্ছিল না। এর আগে বেসরকারি পর্যটন সংস্থা ‘কাছে এসো’র উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন জেলা ট্যুরের যে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলাম তাতে ছেদ পড়ে। সর্বশেষ আমরা গত বছরের ৫ মার্চ সুন্দরবন ট্যুর করি। এরপর থেকেই মূলত ঘরে বসা। তাই কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও আমরা পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় এবং ফেনী জেলা ট্যুরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ফেনী সফরের উদ্দেশ্য ছিল অবসরপ্রাপ্ত মেজর সোলেমানের নিজ হাতে গড়ে তোলা দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং বিখ্যাত সমন্বিত কৃষি খামার, বিশেষ করে বারোমাসি আম বাগান দেখা। ক’দিন আগে ‘চ্যানেল আই’-এ দেশের বরেণ্য কৃষিব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের উপস্থাপনায় এ আম বাগান সম্পর্কে জানতে পারি। সে থেকেই ইচ্ছে ছিল সুযোগ পেলেই মেজর সাহেবের আম বাগান দেখতে যাব। অবশেষে গত ১৫ জানুয়ারি আমরা (মো. জহিরুল হক ভূঁইয়া, কেজি মোস্তফা, হেলাল উদ্দিন এবং আমি) ফেনী জেলার মুহুরী প্রজেক্টের উদ্দেশে যাত্রা করি। আগেই ট্রেনের টিকিট কেনা ছিল। আমরা সকালবেলা চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতীতে যাত্রা শুরু করি। আমরা তিনজন নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুক্ষণ আগেই কমলাপুর স্টেশনে উপস্থিত হই। টেন সিডিউল মতোই সকাল পৌনে ৮টায় যাত্রা শুরু করে। টেনে ওঠার পর আমরা বেশ রিল্যাক্স অবস্থায় চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে থাকি। ট্রেন বেশ ভালোভাবেই চলছিল। ট্রেনে আমরা গল্প করতে করতে কফি খেলাম। এক সময় আমরা ফেনী স্টেশনে উপস্থিত হই। তখন বেলা ১টা বেজে গেছে। আমরা জুমার নামাজ আদায় করি স্টেশনসংলগ্ন স্থানীয় একটি মসজিদে। নামাজ শেষে একটি হোটেলে দুপুরের খাবার গ্রহণ করি। আগেই মেজর মোহাম্মদ সোলায়মান (অব.) সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, শুক্রবার বিশেষ কাজে নোয়াখালী যাবেন। কাজেই তিনি প্রকল্প এলাকায় উপস্থিত থাকতে পারবেন না। তবে তিনি প্রকল্পের দায়িত্বরত অন্যদের নির্দেশ দিয়ে যাবেন, যেন বাগান দেখতে আমাদের কোনো অসুবিধা না হয়। কিন্তু আমরা চেয়েছিলাম তিনি থাকা অবস্থায় আমরা আম বাগান দেখব। তাই পরিকল্পনা পরিবর্তন করে আমরা রামগড় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

 

রামগড় বাজারে গিয়ে যখন উপস্থিত হই, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমরা স্টেশনে অবতরণ করে জানতে পারি এলাকায় কোনো ভালো হোটেল নেই। যে ক’টি হোটেল ছিল তাও করোনার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ করোনার কারণে এলাকায় এখন আর কোনো পর্যটক আসে না। আমরা একটি অটোরিকশা নিয়ে রামগড় হর্টিকালচার সেন্টারে গিয়ে উপস্থিত হই। হর্টিকালচার সেন্টারটি উঁচু পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত। আমরা বেশ কষ্ট করে পাহাড়ের ওপরে চলে যাই। সেখানে হর্টিকালচার সেন্টারের একজন কর্মচারীর কাছে আমাদের থাকার বিষয়টি জানালে তিনি সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক মিজানুর রহমান মজুমদারের কাছে নিয়ে যান। আমরা ঢাকা থেকে এসেছি এবং আসার আগে কোথায় রাত্রীযাপন করব তা ঠিক করে আসিনি, জানতে পেরে তিনি হর্টিকালচার সেন্টারের বাংলোতে থাকার অনুমতি দিলেন। তার আচার-আচরণ ছিল খুবই সুন্দর এবং আন্তরিকতাপূর্ণ। আমরা সেখানে রাত্রীযাপন করি। আমরা যেখানে রাত্রীযাপন করি তার আশপাশে প্রচুর জঙ্গল এবং গাছ-গাছালিতে পূর্ণ। বাংলোর বারান্দায় দাঁড়ালে চারদিকে অনেক দূর পর্যন্ত দৃষ্টি চলে যায়। ক্রমেই রাত গভীর হতে থাকে। আমরা অনেক রাত পর্যন্ত জেগেই ছিলাম। মাঝেমধ্যে রাতজাগা পাখির ডাক শুনতে বেশ ভালোই লাগছিল। নিকষ কালো অন্ধকার এবং নিস্তব্ধ নৈঃশব্দ্যের যে আলাদা চমৎকার একটি রূপ আছে তা এখানে না এলে কেউ অনুভব করতে পারবেন না। সম্ভবত এটাই কবিতা লেখা এবং পড়ার উপযুক্ত স্থান। এমন নির্জন স্থানে মনে বিভিন্ন চিন্তার উদ্ভব হয়। আমাদের একজন বলছিলেন, এলাকাটি অনেকটা খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মিল আছে। এখানকার রাস্তাগুলোও খাগড়াছড়ির মতোই। তাকে বুঝিয়ে বলা হলো, রামগড় খাগড়াছড়ি জেলারই একটি থানা। কাজেই এর সঙ্গে মূল খাগড়াছড়ি জেলার ভূপ্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মিল থাকাটাই স্বাভাবিক। রাতে বেশ ভালোই ঘুম হলো। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, পাহাড়ি অঞ্চল হলেও এখানে আমরা একটা মশার দেখাও পেলাম না। ফলে রাত্রীযাপনে কোনো অসুবিধাই হলো না। রাতের শেষ প্রহরে অজানা পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। ধীরে ধীরে পূর্ব আকাশে আলোর রেখা ফুটিয়ে সূর্য উদয় হলো। আমরা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সকালবেলা পাহাড়ি এলাকার অপরূপ সৌন্দর্য দর্শনে মুগ্ধ না হয়ে পারা গেল না। এখানে বাংলোয় দায়িত্বরত কর্মচারী সুজন চাকমার আন্তরিক ব্যবহারের মুগ্ধ না হয়ে পারা গেল না। সকালবেলা সুজন চাকমা বাজার থেকে আমাদের জন্য নাস্তা নিয়ে এলো। আমরা সবাই মিলে সেই নাস্তা গ্রহণ করি। এরপর হর্টিকালচার সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক মিজানুর রহমান মজুমদারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা একটি অটোরিকশায় রামগড় বাজারে চলে আসি। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় তা হলো, আমরা রামগড় রাস্তার দু’পাশে বেশ কিছু চায়ের বাগান দেখতে পেলাম। বাগানগুলো বেশ সজীব এবং তরতাজা মনে হলো। রামগড়ে ভালো এবং উন্নত মানের চা উৎপাদিত হয় তা আগেই শুনেছিলাম। কিন্তু স্বচক্ষে দেখা হয়নি কখনোই। চা বাগান দেখতে পাওয়া আমাদের জন্য একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা। মাঝেমধ্যে বেশ কিছু রাবার বাগানও দেখতে পেলাম। রাবার আহরণের জন্য ছোট ছোট পাত্র গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। রামগড় পরিদর্শনে গিয়ে আমার শুধুই মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশ জনসংখ্যাধিক্য একটি ছোট দেশ; কিন্তু এর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। রামগড় যাত্রার আগেই শুনেছিলাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি একবার রামগড়ে এসেছিলেন। তিনি এখানে অবস্থানকালে বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছিলেন। তবে এই তথ্যের কোনো সত্যতা আমরা আবিষ্কার করতে পারিনি। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হলেও তারা এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। কাজেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রামগড় আসার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এটা ঠিক যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি সত্যি এখানে এসে থাকেন, তাহলে তিনি নিশ্চিয় খুব খুশি হয়েছিলেন।

আমরা রামগড় বাজারে আসার পর ফেনীগামী একটি বাসে উঠে পড়ি। উদ্দেশ্য ফেনী শহরে যাওয়া। এক সময় আমরা ফেনী শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবতরণ করি। সেখান থেকে আমরা মোবাইল ফোনে মেজর সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার প্রকল্পের লোকেশন জেনে নিই। তারপর একটি অটোরিকশা রিজার্ভ করে মুহুরী প্রকল্পের দিকে যাত্রা শুরু করি। আমার জোহরের নামাজের ঠিক আগ মুহূর্তে মুহুরী প্রকল্প সংলগ্ন চর সাহাপুর এলাকার সোয়াস অ্যাগ্রো লিমিটেড প্রকল্পে উপস্থিত হই। মেজর সাহেব প্রকল্প অফিসেই ছিলেন। আমরা তার সঙ্গে পরিচিত হয় এবং প্রকল্প মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করি। নামাজ শেষে মেজর সাহেব আমাদের প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে নিয়ে যান। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির আমের গাছ এবং অন্যান্য ফলের গাছ আমাদের দেখালেন। তিনি জানালেন, তার পরিকল্পনা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি এলাকায় যেন বারোমাসি আমের চাষ হয়। যেন সবাই সারা বছর আম খেতে পারেন. সেই লক্ষ্যে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা। মোহাম্মদ সোলায়মান তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তার বাবাকে হারান। স্থানীয় জমিদাররা তাদের জমিজমা নিয়ে যান। ১৯৬৮ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি অর্জনের মাধ্যমে মেজর র‌্যাংকে উন্নতি হন। পরবর্তী সময়ে তিনি সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। এক পর্যায়ে তিনি কৃষি খামার গড়ে তোলার প্রতি মনোযোগী হন। তিনি গত ২৭ বছর ধরে কৃষি খামারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। মেজর সোলায়মান যে কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন তা অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যম-িত একটি সমন্বিত খামার। তিনি দেশের জনগণের জন্য ফলের জোগান দেওয়ার লক্ষ্যে এখনও নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। বর্তমানে তার খামার এলাকার আওতায় ২২টি পুকুর রয়েছে। এগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে। তার প্রকল্প এলাকায় ৪ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন জাতের আম গাছ রয়েছে। বেশিরভাগ গাছেই এখন আম ধরে। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই আরও ১ হাজার আম গাছ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। তার বাগানে যেসব আম গাছ রয়েছে, তার বেশিরভাগই উন্নতজাতের। ভারত, থাইল্যান্ড থেকে বারোমাসি আমের চারা এনে তিনি এখানে রোপণ করেছেন। অনেকগুলো জাত বিদেশ থেকে আনা হয়েছে। তার বাগানের বারোমাসি আমগাছগুলো সবার মনেই বিস্ময়ের উদ্রেক করে। প্রকল্প এলাকায় ৩০০টি কাঁঠাল গাছ আছে। এছাড়া রয়েছে ৫০০টি সুপারি গাছ। ড্রাগন ফলের গাছ রয়েছে ৫০টির মতো। সোয়াস অ্যাগ্রো প্রকল্পে মোট ৩০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রকল্পে মধু উৎপাদিত হয়। এ প্রকল্পের মধু দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। সোয়াস অ্যাগ্রো লিমিটেড প্রকল্পে বছরের সব সময়ই আম পাওয়া যায়। প্রতি বছর গড়ে ২২ থেকে ২৫ টন আম উৎপাদিত হয়। মেজর মোহাম্মদ সোলায়মান (অব.) তার প্রকল্পে উৎপাদিত খাঁটি মধু দিয়ে ক্লিনহার্ট নামে এক ধরনের হারবাল ওষুধ তৈরি করেছেন। এটা নিয়মিত সেবন করলে হার্টের ব্লক থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সারা দেশে এ ওষুধ সরবরাহ করা হয়। মেজর সাহেব জানালেন, ক্লিনহার্ট সেবন করে অনেকেই উপকৃত হয়েছেন। ফলে এর চাহিদা দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আম বাগান দেখনোর সময় মেজর সোলায়মান বারবারই বলছিলেন, আমি যতদিন বেঁচে থাকব, এই বাগানের পরিচর্যা করে যাব। পরবর্তী সময়ে তার উত্তরাধিকারীরা এই বাগান দেখাশোনা করবে। তিনি চান সারা দেশে তার আম বাগানের মতো আম বাগান গড়ে উঠুক। যেন বাংলাদেশ আম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। সৃষ্টিশীল এক ব্যক্তি একটি এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা পরিবর্তনে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে মেজর মোহাম্মদ সোলায়মান (অব.) তার জ্বলন্ত উদাহরণ। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করার পর নিজেদের অপাঙ্ক্তেয় মনে করেন। নিজেকে সমাজের বোঝা ভাবেন তাদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মেজর মোহাম্মদ সোলায়মান (অব.)। আমরা চাই দেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলে মেজর মোহাম্মদ সোলায়মান (অব.) এর মতো সৃষ্টিশীল মানুষের আবির্ভাব ঘটুক। বাংলাদেশ একটি আশ্চর্যজনক দেশ। এখানে জনসংখ্যাধিক্য থাকলেও সম্ভাবনার কোনো কমতি নেই। বাংলাদেশের ফল এবং মাছসহ অন্যান্য খাবার সবচেয়ে সুস্বাদু। এর কোনো তুলনা হয় না। শুধু উদ্যোগের অভাবে বাংলাদেশ এখনও তার সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারছে না।

কৃষিবিদ ড. এম এ মজিদ মন্ডল : আম হলো বাংলাদেশে ফলের রাজা এবং গাছ হলো জাতীয় গাছ। আম সাধারণত উষ্ণ ও অবউষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের স্বার্থকভাবে জন্মে। ইন্দো-র্বামা অঞ্চলে আমের উৎপত্তিস্থল বলে ধারণা করা হয়, তবে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহামহাদেশে আম সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল। কারণ- আমের বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার, পুষ্টিমান ও স্বাদে-গন্ধে অতুলনীয়। বাংলাদেশে প্রায় সব অঞ্চলে আম জন্মে কিন্তু দেশের উরাঞ্চলে এর বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক চাষ হয়ে থাকে। সাধারণত দুই প্রকারের সমস্যার কারণে আম চাষিরা প্রতি বছর অনেক ক্ষতির শিকার হয়ে থাকেন। এগুলো হচ্ছে- (১) প্রাকৃতিক কারণ (যেমন- ঝড়, শিলাবৃষ্টি, খরা প্রভৃতি) এবং (২) রোগ ও পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত। সঠিক পরিচর্যা ও রোগ-পোকামাকড় দমন করে প্রথম ক্ষতি আংশিক এবং দ্বিতীয় ক্ষতি প্রায় সম্পূর্ণরুপে সমাধান করা সম্ভব। আম গাছের ফল ধারন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ফলন বাড়ানোর জন্য নিম্নলিখিত পরিচর্যাগুলো করা একান্ত প্রয়োজন:

পরগাছা দমন

আমগাছে একাধিক জাতের আগাছা জন্মাতে দেখা যায় যা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। পরগাছাসমূহে শেঁকড়ের মতো এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া হয় যা গাছের মধ্যে প্রবেশ করে রস শোষন করে খায় এবং গাছেকে দুর্বল করে ফেলে। পরগাছার প্রাদুর্ভাব বেশি হলে গাছের পাতার আকার ছোট ও ফ্যাকাসে হয় এবং অনেক সময় গাছ মারা যায়। এর ফলে গাছের ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। তাই ভালো ফলন পেতে হলে অবশ্যই পরগাছা অপসারন করতে হবে।

সার প্রয়োগ

গাছের বৃদ্ধি ও ফল উৎপাদনের জন্য সারের ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন। ফলন্ত গাছের আকার, বয়স ও মাটির উর্বরতার ওপর সারের পরিমাণ নির্ভর করে। দুপুর বেলা যতটুকু স্থানে ছায়া পড়ে সেটুকু স্থানে মাটি কুপিয়ে সার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে।

সেচ প্রয়োগ

সাধারণত জমির উপরের স্তরে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান থাকে যা সার হিসেবে মাটিতে মিশিয়ে দেয়া হয়। তাই আম বাগানের উপরের ২-৩ মিটার অংশকে জমির পানি সংরক্ষণ স্তর হিসেবে ধরা হয়। তাই শুস্ক মৌসুমে আম বাগানে পানি সেচ দেয়া দরকার। আমের গুটি মটর দানার মতো হওয়ার পর থেকে ১৫-২০ দিন পর পর ২-৩ বার সেচ দিলে আমের গুটি ঝরা বন্ধ হয়।

টক আমগাছকে মিষ্টি গাছে রূপান্তরকরণ

বাগানের কোন গাছের আমের গুনাগুন খারাপ হলে সে গাছকে নষ্ট না করে ভিনিয়ার কলমের মাধ্যমে উন্নতি সাধন করা য়ায়। বয়স্ক গাছের ২-৩ টি ডাল কেটে দিলে সেখান থেকে ন’তন শাখা বের হলে তার পর নতুন শাখাতে ভিনিয়ার কলম করে নিতে হবে। এভাবে ৩-৪ বারে কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

পুরাতন বাগান নবায়ণ

আম বাগানের বয়স বেশি হলে ফল ধারণ কমে যায়। এক্ষেত্রে গাছ কেটে না ফেলে পুরাতন গাছের ভারী শাখা কেটে দিলে সেখানে নতুন শাখা বের হবে এবং গাছ নবায়ণ হয়ে যাবে। এভাবে ২-৩ বছরে বাগান নবায়ণ করা যায়।

ফসল সংগ্রহ

ফল ধরার ৩-৫ মাসের মধ্যেই জাতভেদে ফল পাকা শুরু করে। বাণিজ্যিকভাবে কখনো সম্পূর্ণ পাকা আম গাছ থেকে পাড়া ঠিক নয়। গাছের ফল দুই চারটি পাকা শুরু করলে বাঁশের কোটার মাথায় থলে সদৃশ্য জালতি লাগিয়ে আম পাড়তে হবে যেন আঘাত না লাগে। গাছের নিচে সাময়িকভাবে রাখতে হলে খড় বিছিয়ে তার উপর রাখতে হবে। নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখে ফল সংগ্রহ করতে হবে-

(১) আমের বোটার নীচে হলুদ বর্ণ ধারণ করবে। (২) পানিতে দিলে ডুবে যাবে। (৩) কস বের হলে দ্রুত শুকিয়ে যাবে। (৪) দুই একটি পাকা আম গাছ থেকে ঝরে পড়বে।

ফল সংরক্ষণ

আম পচনশীল ফল। বেশি পাকা অবস্থায় সংগ্রহ করলে সংরক্ষণকাল কম হয়। অধিকাংশ জাতের আম ১৩-১৭ ডিগ্রী সে. তাপমাত্রায় ও ৮৫-৯০% আপেক্ষিক আর্দ্রতায় বাঁশের ঝুড়ি, বাস্কেট, খড় বিছানো প্রভৃতিতে স্থানে  ৪-৭ সপ্তাহ সংরক্ষণ করা যায়।

রিজুভেনাইজেশন বা উজ্জ্বীবিতকরণ হচ্ছে এমন একটি  পদ্ধতি যার মাধ্যমে বয়স্ক বা ঘন করে লাগানো গাছ/বাগান, যে গাছে/বাগানে আদৌ ফল ধরে না বা  খুবই কম ফল দেয় সে ধরণের ফল গাছ/বাগানকে ফল উৎপাদনক্ষম করে তোলার পদ্ধতি। সাধারণত ১৫-২০ বছর বয়সী বাগানে আগের চেয়ে ফল উৎপাদন কমে যায়, গাছ দূর্বল হয়ে পড়ে, গাছ বা বাগান ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সম্পাদন করা জটিল হয়ে উঠে এবং রোগ ও পোকা-মাকড় দ্বারা গাছ বেশী আক্রান্ত হয়। পোকা-মাকড় সহজে দমন করা যায় না। এমতাবস্থায় নিম্নলিখিত জটিলতা দেখা যায়।
* ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায় অথবা হয়-ই না।
* ডালে শর্করা ও নাইট্রোজেনের প্রয়োজনীয় অনুপাতের (ঈ:ঘ) ব্যাঘাত ঘটে। আমের ডালে মুকুল আসতে হলে, ফুল আসার আগে ডালটিতে পর্যাপ্ত পরিমানে অধিক শর্করা ও কম নাইট্রোজেন দুই-ই থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, শর্করার ভাগ নাইট্রোজোনের ভাগের চেয়ে যথেষ্ট বেশী থাকতে হবে। আর যদি দু’টির ভাগ সমান হয় বা বিশেষ করে ডালটির নাইট্রোজেনের মাত্রা শর্করার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে ঐ ডালের ডগায় মুকুল আসার বদলে পাতা  এসে যায়।
* ঘন করে লাগানো বাগানের ক্ষেত্রে, গাছের মধ্যে খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা চলে। ফলে গাছ পরিমিত খাদ্য পায় না।
* ঘন ডালপালা থাকার কারণে আলো ও বায়ু চলাচল ঠিকমত হয় না বলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যহত হয়।
বয়স্ক/ঘন বাগানে মরা, রোগাক্রান্ত এবং পোকাক্রান্ত ডালপালা বেশি থাকে। উক্ত ডালপালা গুলো খাবার নেয় কিন্তু কোন ফলও ধরে না, ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়।
* গাছের নীচের দিকের ডালপালায় রোদ কম পড়ে, ফলে ফলন হয় না বললেই চলে। তাছাড়া ঐ সমস্ত ডালগুলো রোগ ও পোকার আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যহত হয়।
রিজুভিনাইজেশন পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা: রিজুভেনাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বয়স্ক, অনুৎপাদনশীল/ঘন আম বাগান বা গাছকে উজ্জ্বীবিত করা যেতে পারে যা নি¤েœ বর্ণনা করা হলো-
* বয়স্ক, অধিক ঘন এবং ফল হয় না এমন বাগান/গাছ আগষ্ট-সেপ্টেম্বর মাসে মাটি থেকে ২.৭৫ মি- ৩.০০ মিটার উচ্চতায় গাছের সমস্ত ডাল কেটে ফেলতে হবে।
* কর্তিত অংশে আলকাতরা/রং এর প্রলেপ দিতে হবে।
* সার, সেচ ও নিকাশ ব্যবস্থা করতে হবে।
* ডাল কাটার পর ৩-৪ মাসের মধ্যে নতুন কুশি বের হবে।
* ডাল কাটার পর ৬-৭ মাসের মধ্যে ঘন শাখা প্রশাখা বের হবে।
* প্রতিটি শাখায় সুস্থ-সবল, মোটা-তাজা ৫-৭টি ডাল রেখে, রোগাক্রান্ত, মরা, কীটাক্রান্ত, দূর্বল ডালসহ বাকীডালগুলো কেটে ফেলতে হবে।
* ডাল কাটার পর মূলগাছে ও নতুন গজানো পাতায় রোগ ও পোকামাকড়েরর উপদ্রব বেশি হয়। এজন্য গাছের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করতে হবে।
* কর্তিত গাছে প্রথম বছরে কোন ফল পাওয়া যায় না।
* দ্বিতীয় বছর পর্যন্ত কর্তিত গাছের নতুন গজানো ডাল পাতলাকরণের কাজ চলতে থাকবে।
* দ্বিতীয় বছরে জানুয়ারি- ফেব্রæয়ারি মাসে কর্তিত গাছের গজানো শাখায় ফুল আসবে।
* দ্বিতীয় বছরে কর্তিত গাছের নুতন গজানো শাখায় ফল ধরে।
যথাযথ ব্যবস্থাপনায় তৃতীয় বছরে কর্তিত গাছটি একটি পূর্ণাঙ্গ ফলবান বৃক্ষে পরিণত হবে।
সার প্রয়োগ : কর্তিত গাছে নতুন ডালপালা গজানো ও সতেজ করার লক্ষ্যে আম বাগানে চাষ দিয়ে বা গাছের গোড়া আগাছা মুক্ত করে জৈবসার প্রয়োগের পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা অত্যাবশ্যক। গাছের গোড়ায় সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে গোড়া থেকে ১.০-১.৫ মিটার দূরে নালা পদ্ধতিতে সার দেয়া যেতে পারে।  এ ক্ষেত্রে যে সমস্ত সার প্রয়োগ করতে হবে তা সারণি-১ দ্রষ্টব্য।
উল্লেখিত সারগুলোর অর্ধেক পরিমাণ সার গাছের ডাল কাটার পর পরই প্রথম ধাপে প্রয়োগ করতে হবে এবং দ্বিতীয় ধাপে বাকি অর্ধেক সার  আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে প্রয়োগ করতে হবে।
সেচ ও নিকাশ: সার প্রয়োগের পর উক্ত সার যাতে গাছ গ্রহণ করতে পারে সে জন্যে আম বাগানে প্রথমে একটি সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। এর পর মাঝে মাঝে গাছের প্রয়োজন অনুসারে এমন ভাবে সেচ দিতে হবে যেন মাটিতে রস থাকে। লক্ষ রাখতে হবে যেন আম বাগানে বা গাছের গোড়ায় যেন কোন অবস্থায় দীর্ঘ সময় পানি জমে না থাকে।
পোকামাকড় ও ব্যবস্থাপনা
পাতাখেকো শুঁয়োপোকা
এ পোকার কীড়া (বাচ্চা) চারাগাছ ও বড় আমগাছের পাতায় আক্রমণ করে। স্ত্রী মথ আমপাতার ওপরের পিঠের কিনারায় লাইন করে মুক্তার দানার মতো সাদা ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে কীড়া বের হলে, কীড়াগুলো প্রথমে  ঐ পাতার ওপর গুচ্ছাকারে থাকে, পরে গাছে ছড়িয়ে যায় এবং পাতার মধ্যশিরা রেখে পুরো পাতা খেয়ে ফেলে  আক্রান্ত গাছ সম্পূর্ণ বা আংশিক পাতাশূন্য হয়ে পড়ে। এতে গাছের খাবার তৈরি বাধা পায় এবং গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। আক্রমণ খুব বেশি হলে গাছে ফুল ও ফল হয় না।
দমনব্যবস্থা
ডিমসহ পাতা দেখামাত্রই সংগ্রহ করে পুড়িয়ে মারতে হবে। গুচ্ছাকারে বা ছড়ানো অবস্থায় থাকা শুঁয়োপোকাগুলো সংগ্রহ করে পা-দিয়ে পিষে বা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। পা-দিয়ে পিষে মারার সময় অবশ্যই পায়ে স্যান্ডেল বা জুতা থাকতে হবে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলিলিটার ডাইমেক্রন/ ডায়াজিনন ৬০ ইসি (৪ কর্ক) বা সুমিথিয়ন ৫০ ইসি (৪ কর্ক) মিশিয়ে পাতা ও           ডাল-পালাসহ গাছের গোড়ার মাটি ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।
পাতাকাটা উইভিল ক্ষতির ধরন: এ পোকা কচি আমপাতার নিচের পিঠে ছোটছোট গর্ত করে ডিম পাড়ে। এরপর ডিমসহ কচিপাতাটি (লাল পাতা) রাতের বেলা বোঁটা থেকে একটু দূরে কাঁচি দিয়ে কাটার  মতো করে কেটে ফেলে দেয়। এতে গাছের নুতন পাতা ধ্বংস হয় এবং খাবার তৈরি কমে যায়। ফলে চারা বা গাছ দুর্বল হয়ে যায়।
দমনব্যবস্থা
আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে গাছে কচিপাতা দেখার সাথে সাথে প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২০ মিলিলিটার সুমিথিয়ন ৬০ ইসি (৪ কর্ক) মিশিয়ে গাছসহ গাছের গোড়ার মাটি ভিজিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। এ পোকা দিনের বেলায় গাছের নিচে পড়ে থাকা পাতার নিচে ও আগাছার মধ্যে লুকিয়ে থাকে। তাই গাছের নিচে পড়ে থাকা কচিপাতা দেখামাত্র সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
ফল ধারণ: আম গাছকে উজ্জীবিতকরণ করার প্রথম বছরের পর ঐ গাছে সাধারণত কোন ফল ধরে না তবে ঠিকমত ব্যবস্থাপনা দিলে দ্বিতীয় বছর থেকে গাছে ফল ধরা শুরু হয়।

 

তথ্যৎ ১পরিচালক, বাউ-জার্মপ্লাজম সেন্টার, বা.কৃ.বি., ময়মনসিংহ। ২এসএসও, উদ্যানতত্ত¡ বিভাগ, বিনা, মোবা : ০১৭১১১২৪৭২২ ই-মেইল : This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.

এক গাছেই মুকুল, গুটি আর পাকা আম। বিষয়টি শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটাই সত্যি! বগুড়ার শেরপুরের তিন বন্ধুর ওই আমবাগানে গেলে যে কারোরই চোখ আটকে যাবে। মামুন, সোহেল ও শহিদুল, মেধাবী এই তিন তরুণের কৃষির প্রতি দুর্নিবার টান। তাই পড়ালেখা শেষে গড়ে তোলেন মিশ্র ফলের বাগান। নাম দিয়েছেন ‘ফুল অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেড’। বারোমাসি আম চাষে বেশ সফলতাও পেয়েছেন তাঁরা। এরই মধ্যে বাগানের উৎপাদিত রকমারি ফল বাজারজাত শুরু হয়েছে।

তিন বন্ধুর বারোমাসি এই ফলের বাগান ছাড়াও বরেন্দ্র জনপদের চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর, নাচোল, রহনপুর; নওগাঁর সাপাহার, পোরশাসহ বিভিন্ন স্থানে এখন বারোমাসি আমের দেখা মিলছে।

বছরে তিনবার ফল দেওয়া বারি-১১ এবং থাইল্যান্ডের কাটিমন জাতের আম চাষে ঝুঁকছেন অনেকেই।

বগুড়ার শেরপুরের খামারকান্দি ইউনিয়নের মাগুড়াতাইর গ্রাম। ওই গ্রামের প্রায় ৪০ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে এই মিশ্র ফলের বাগান। এর মধ্যে ১৮ বিঘা জমিতে চাষ হয়েছে বারোমাসি আম। সেখানে রয়েছে ৯ হাজার আমের গাছ। একই গাছের এক ডালে ধরেছে মুকুল, পাশাপাশি অন্য ডালে একই সঙ্গে ঝুলছে কাঁচা-পাকা আম।

উদ্যোক্তা তিন তরুণ জানান, ২০০৫ সালে ছোট পরিসরে নিজেদের পাঁচ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয় বাগানটি। পরে আরো ৩৫ বিঘা জমি ২০ বছরের জন্য লিজ নিয়ে বাগানের পরিসর বাড়ানো হয়। তাঁদের বাগানে প্রায় ১৫ হাজার রকমারি ফলের গাছ রয়েছে। এর মধ্যে বারোমাসি আম কাটিমন ও বারি-১১, মাল্টা, পেয়ারা ও বরই রয়েছে। বাগানের ফল খুবই সুস্বাদু ও গুণগত মানেও সেরা। অন্যান্য ফলের উৎপাদন ভালো হলেও বর্তমানে বারোমাসি আম বিক্রিতে ব্যস্ত উদ্যোক্তারা। অ সময় পাওয়া এই ফলের চাহিদাও বাজারে অনেক বেশি।

তাঁরা জানান, আগে পাকা আম পাইকারি ৩০০ টাকা কেজিদরে বিক্রি করলেও এখন ৫০০ টাকায় বিক্রি করছেন। এরই মধ্যে দুই লাখ টাকার আমও বিক্রি করেছেন। আরো এক লাখ টাকার আম বাগানে রয়েছে। এই সাফল্য দেখে এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই জাতের আম চাষে আগ্রহ বাড়ছে। তাই অনেকেই বারোমাসি আমের চারা কিনতে আসছেন। যেভাবে সাড়া দেখা যাচ্ছে তাতে এ বছর ১০ লাখ টাকার ওপর এই ফলের চারা বিক্রি হতে পারে। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এই মিশ্র ফলের বাগান থেকে এক কোটি টাকার আম, বরই ও পেয়ারা বিক্রি করতে পারবেন বলেও আশা তাঁদের।

উদ্যোক্তা মামুনুর রশিদ ও সোহেল রেজা জানান, তাঁরা কৃষক পরিবারের সন্তান। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে ছুটে যেতেন ক্ষেতে। এর আগেও বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি চাষ করে এলাকার সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। এমনকি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দেশসেরা কৃষক হিসেবে নির্বাচিত করে মামুনকে থাইল্যান্ডে ফুড প্রডাকশন ও ম্যানেজমেন্টের ওপর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। তিনি সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফেরেন। এরই মধ্যে সোহেল রেজা বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) থেকে বারোমাসি আম চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নেন।

আরেক উদ্যোক্তা শহিদুল ইসলাম জীবিকার তাগিদে মালয়েশিয়ায় গেলেও ২০০১ সালে দেশে ফেরেন। ওই সময় স্কুলজীবনের বন্ধু মামুন ও সোহেলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফল বাগানের স্বপ্ন বোনেন। তিন বন্ধু বগুড়ার মহাস্থান, হর্টিকালচার সেন্টারসহ স্থানীয় মহিপুর এলাকার বিভিন্ন নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করে নিজেদের পাঁচ বিঘা জমিতে মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তোলেন। এরপর আরো জমি লিজ নিয়ে সেখানে লাগান বারোমাসি আম, পেয়ারা, মাল্টা ও বরই চারা। সময়ের ব্যবধানে বাগানটিতে লাগানো হয় রকমারি ফলের আরো ১৫ হাজার গাছ।

উদ্যোক্তা মামুনুর রশিদ জানান, সারা বছর আম পাওয়া যাবে তা কখনো কেউ ভাবতেও পারেনি। বিষয়টি স্বপ্নের মতো মনে হলেও এটাই বাস্তব হয়েছে। বছরে তিনবার এসব গাছে মুকুল ধরে। সেই সঙ্গে অল্প সময়ের মধ্যে একই গাছের বড় বড় আমগুলো খাওয়ার উপযোগী হয়। আমগুলো বিশেষ পদ্ধতিতে ব্যাগে ঝুলিয়ে গাছেই রাখা হয়। সেটা গাছে পাকার পর বিক্রি করা হয়।

শেরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, এ উপজেলায় মিশ্র ফলের বাগান বাড়ছে। আমরা পরামর্শসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছি। মাগুড়াতাইর গ্রামে গড়ে ওঠা ফুল অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেড নামের মিশ্র ফলের বাগানের উদ্যোক্তাদেরও সব সময় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিন বন্ধুর এই মিশ্র ফলের বাগানটি সবার জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।

বগুড়া হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক আব্দুর রহিম জানান, বারোমাসি আম চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। যার উত্কৃষ্ট উদাহরণ শিক্ষিত এই তিন তরুণ উদ্যোক্তা। বারোমাসি আমের বাগান করে তাঁরা বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন। সেই সঙ্গে সবার আদর্শ হয়েছেন। তিনি আশা করেন খুব অল্প সময়ের মধ্যে বারোমাসি আম চাষ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।

অসময়ে আম খেতে পাওয়া কতনা মজাদার? তাও আবার শীত মৌসুমে, বারি-১১ ও আশিনা আমের ফলন ফলাচ্ছেন তিনি। বলছিলাম গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের নওদাপাড়া গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা সিরাজুল ইসলামের কথা। 

তিনি ২০১৯ সালের জুন মাসে পার্বতীপুরের মহেশপুর গ্রামে 'বারমাসী ম্যাংগো ফার্ম' আমরুপালি আমের বাগান নিয়ে শুরু করে পরিচর্যা। নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে ১৫'শ' গাছের সাইনিং শুরু করেন তিনি। 

কৃষি উদ্যোক্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ১৫ বছর আগে থেকে আমার সখ ছিল, যখন মানুষ আগ্রহ করে আম খায়, যখন শেষ হয়ে যায়, তখন আর থাকে না ও পায়ও যায় না। কিন্তু এই যে আম থাকে না, কিন্তু আম পছন্দ করে, সারা বিশ্বব্যাপী আমের একটা চাহিদা আছে, পরিচিতিও আছে। কিন্তু শেষ হয়ে গেলেও আম খাওয়ার আনন্দটা হারায় না। 

সেগুলো ভেবে আজ থেকে পনের বছর আগে একটি জাত সংগ্রহ করেছিলাম আমি, বোয়ালিয়া ইউনিয়নে এক বিঘা বাগানের প্রজেক্ট  করেছিলাম আমি, কিন্তু আম পাকার পরে তা আর খাওয়া যেত না। এই বিষয়কে মাথা রেখে আমি ২০১৮সালে আমার ভাই কমান্ডার রেজাউল করিমের পরামর্শে একটি বাগান তৈরি করি। ফলে নিজের বাগানে একটি প্রজেক্ট তৈরি করি আমি। সেই প্রজেক্টে পরীক্ষামূলকভাবে আমি আম উৎপাদনে সফলতা অর্জন করি এবং ভালো একটা মুনাফা পাই।

 
তার সুবাদে উপজেলার পার্বতীপুর ইউপি’র মহেশপুর গ্রামে ১২ বিঘা জমিতে বাড়ি-১১ জাতের আম বাগানের চাষ শুরু করেন তিনি। 

২০১৯ সালের জুন মাসে আম বাগান প্রজেক্টের কাজ শুরু করেন। আমরুপালি থেকে সাইনিং করে বাড়ি-১১ আমের ফলন ফলান তিনি। বছরে বিঘাপ্রতি ২৫ হাজার করে, ১২বছরে তিনি ৩০লক্ষ টাকায় জমি লিজ নিয়ে প্রজেক্টের কাজ শুরু করেন। 


পরিচর্যার বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম জানান, তিনি নিজে বই পড়ে মেধা ও কঠোর পরিশ্রম করে গাছের পরিচর্যা করে এখন গাছকে সতেজ রেখে ভালো মানের ফলন ফলিয়েছেন। অন্য কৃষকের থেকে তার পরিচর্যার বিষয়টা একটু অন্যরকম। অন্যরকম বলতে কী? 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জৈব সার ব্যবহারের ক্ষেত্রে যেহেতু খরচ অনেক বেশি, তাই গাছের ফলন আসার পূর্ব মুহূর্তে সঠিক পরিচর্যায় কম খরচে উপযুক্ত সময়ে গাছে জৈব সারের পরিবর্তে ভার্মি কম্পোস্ট ও কিছু পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করি। 

তিনি উপযুক্ত সময় কীটনাশক ব্যবহার করে হপার ও উইপোকার আক্রমণ কিছু পরিমাণ দেখা গেলে তা ভালোভাবে দমন করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এক কথায়, তিনি বলেন গাছের খাদ্য সঠিক সময়ে দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায় আর আমি সেটাই করে থাকি। 

তার বাগানে বারি-১১ আমের আয়-ব্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১৮ মাসে অর্থাৎ ১ বছর ৬ মাসে তার আনুমানিক ২০ থেকে ২২ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছে, যেহেতু প্রথম বছরে তার ইচ্ছে ছিল লাভবান হওয়ার, তাই তিনি নানা প্রতিকূলতা পের করে ১৫ লক্ষ টাকা আয় করতে সক্ষম হয়েছেন। এখনও তিনি বাজারজাত করে ভালো মুনাফা পাচ্ছেন। 
আম উৎপাদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাড়ি-১১ গাছে ৬১টি করে প্রতিটি আমের পরিমাণ আনুমানিক ৩৫০-৭৫০ গ্রাম করে ২০ কেজি করে হয়ে থাকে। আম খেতে মাঝারি মিষ্টি, যার মিষ্টতা অর্থাৎ টি,এস,এস প্রায় ১৮/১৯, হালকা আঁশযুক্ত খুব সুস্বাদু। 

উপজেলার সফল উদ্যোক্তা সিরাজুল ইসলামের সম্ভাবনায় আম উৎপাদনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এলাকায়। তিনি সরকারি প্রণোদনা পেলে বেশি বড় প্রজেক্ট করে আম উৎপাদনে বাংলাদেশ তথা বিদেশে অর্থনৈতিকভাবে রপ্তানি করে দেশের মানুষের অসময়ে আমের চাহিদা পূরণ করা তার ইচ্ছা। 

কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হোসেন জানান, তিনি প্রায় দেড় মাস আগে সিরাজুল ইসলামের বাগান পরিদর্শন করেন এবং বাগান পরিচর্যার বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছেন। এই উপজেলার মধ্যে অসময়ে এতো বড় বারোমাসি বাগানের আম চাষী নতুন উদ্যোক্তা সিরাজুল ইসলামের লক্ষ্যমাত্রা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। তাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতা প্রদান করা হবে বলেও আশ্বাস প্রদান করেছেন তিনি।

টেকনাফের সমুদ্র উপকূলীয় আবহাওয়া বারি আম চাষের জন্য উপযোগী তাই সারাবছর ফলনের জন্য এই প্রজাতির আম চাষ করার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন পাহাড়তলি কৃষি গবেষনাগারের প্রধান ড. হারুন অর রশিদ।

৯জানুয়ারী সকাল ১০টায় চট্রগ্রাম পাহাড়তলি কৃষি গবেষনাগারের প্রধান ড. হারুন অর রশিদ টেকনাফ সদর ইউনিয়নের হাবিরছড়ায় আমের মুকুল আসা গ্রাম পরিদর্শন করেন। এসময় টেকনাফ উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শফিউল আলম সাথে ছিলেন। এসময় কৃষি গবেষখ ড. হারুন বলেন যেহেতু এই এলাকার আবহাওয়া আগাম আম আসতে উপযোগী তাই, বার মাসি আমের জাত বারি আম-১১ এই এলাকায় বাগান করা হলে ভবিষ্যতে অপ সিজনে আমের ফলন হবে। যাহা এই এলাকার মানুষের আগ্রহ বেড়ে যাবে। চলতি অর্থ বছরে এই এলাকার জন কিছু বার মাসি জাত বারি আম ১১ এর প্রর্দশনী বাস্তবায়ন করা হবে। গত ৩বছর ধরে এই আগাম জাতটি নিয়ে গবেষনা করছে এই গবেষনা প্রতিষ্ঠানটি।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে উক্ত গবেষনাগার হতে একটি টীম এসে আগাম আমের মুকুল আসা গাছ হতে কিছু (সাইয়ন) আমের ঢাল নিয়ে গিয়েছিল। পরে অন্য আম গাছের সাথে জোড়া লাগিয়ে দেখবে এই সময়ে অন্য জায়গায় আমের মুকুল আসে কিনা যদি আসে তাহলে আরো উন্নত করে সারা দেশে ছড়িয়ে দিবে। আর যদি না হয় তাহলে বার মাসি বারি আম ১১ এই সম্প্রসারণ করবে।
এই বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. ভবসিন্ধু রায় জানান,টেকনাফের আবহাওয়া আম চাষের উপযোগী তাই টেকনাফের প্রত্যন্ত এলাকায় আমের মুকুল দেখা দিয়েছে। এই এলাকায় আগাম মুকুল আসে তাই বার মাসি জাতের বারি আম ১১ অত্র অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা হলে অফ সিজনে আম পাওয়া যাবে এবং ফলের চাহিদা পুরন হবে। ফলে কৃষকেরা আগ্রহী হবে।

আম পছন্দ করেন না এমন মানুষ পাওয়া প্রায় দুষ্কর। টসটসে রসে ভরা আম আসলে তিনবার খাওয়া তাহলেতো প্রশ্নই আসেনা। প্রথমত রঙ দেখেই একবার ঢোক গিলতে হয়। ঘ্রাণেই একবার পেট ভরে, আরেকবার মুখে পুরে।

ফলের রাজা নিয়ে সাধারণের যখন এই অবস্থা, তখন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কি আর বসে থাকতে পারে! প্রতিনিয়ত সরকারি এ সংস্থাটি করে যাচ্ছে নিরলস গবেষণা কিন্তু তাতে কি হবে বর্তমানে চাষী মোঃ সিরাজুল ইসলাম গ্রাম দরবারপুর,উপজেলা গোমস্তাপুর,জেলা চাঁপাই নবাবগঞ্জ তিনি প্রায় ৪ একর জমি জুড়ে গত ২০১৫ ইং সাল থেকে উন্নত জাতের আম বারি-১১ চাষ করে চলেছেন।মানুষ অসময়ে আম খেতে পেলেও নেই কোন প্রসার ।তিনি কোন দপ্তত থেকে কোন প্রকার সহযোহিতা পাননি এখনও ।প্রায় গনমাধ্যামের দৃষ্টি আকর্শন করলেও এ জাতের প্রসারের ব্যাপকতা বিন্দু পরিমান নেই।তিনি এর প্রসার ঘটাতে চান । যদি সরকারি মহলের কোন প্রতিষ্ঠানে এগিয়ে আসে তিনি খুব তাড়াতাড়ি এর প্রসার ঘটাতে সক্ষম হবেন বলে তিনি আশা করেন ।তার কথার প্রসঙ্গে তিনি বলেন আমি নিরলস ভাবে কাজকরে চলেছি কিন্তু কেউ আমার চাষের খোজ খবর নেননী।

এটা প্রথমে আমি এওকক প্রচেষ্টায় করি তারপরও আমার পাশে কেউ এগিয়ে আসেনী। আমি আমার কাজ চাইয়ে যাব । বাঙ্গলাদেশের মানুষ্কে আমি অসময়ে আম উপহার দেব। একঝাঁক একনিষ্ঠ বিজ্ঞানী প্রতিবছরই নিত্যনতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন কিভাবে উন্নয়ন করা যায় আমের। কত স্বাদ, রঙ আর পুষ্টিদায়ী জাত উদ্ভাবন করা যায়।

এই যখন অবস্থা, তখন সংস্থাটি একের পর এক ভিন্ন মাত্রার প্রজাতি যোগ করছে ফলের বাগানে। সংস্থাটি দীর্ঘকাল ধরে গবেষণা করে এমন একটি জাত আবিষ্কার করেছে যা বছরে একবার নয়, তিন-তিনবার ফল দেয়। এতে সারাবছরই বাজারে পাওয়া যাবে আম। আর এমন দিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয়, যখন দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়বে এ জাতটি। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পাহাড়তলী উদ্যানতত্ব গবেষণা কেন্দ্র এ জাতটির আবিষ্কার করেছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে বারি-১১।

একে বলা হচ্ছে বারমাসি জাতের আম। স্থানীয়ভাবে সংগ্রহের পর নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে ২০১৫ সালে এ জাতটি মুক্তায়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণ দেশীয় আম। কৃত্রিম হাইব্রিড নয়। এটি প্রাকৃতিকভাবে সংকরায়ণে সৃষ্ট। একটি গাছের আমের আঁটি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রেখে যে গাছ হয়েছে তার ফল দেখে বেছে বেছে একটি নমুনা নেওয়া হয়েছে। যেটি কিনা বছরে তিনবার ফল দেয়। আর এ জাতের সৃষ্টি হয়েছে মৌমাছির মাধ্যমে। মধু সংগ্রহের জন্য যখন মৌমাছি কোনো একটি জাতের আমের মুকুলে বসে, তার আগে হয়তো অন্য কোনো জাতের মুকুল থেকেই সে ওঠে আসে। আর এভাবেই পরাগায়ণের ফলে এই ধরনের সংকরায়ণ ঘটেছে। এ জাতটির এভাবেই সৃষ্টি।

যা পাহাড়তলী উদ্যানতত্ব গবেষণা কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণের পর নিশ্চিত হয়েছে। বারি-১১ বা বারমাসি এ আমের জাতটি এখন দেশের সব উদ্যানতত্ব গবেষণা কেন্দ্রেই চাষ হচ্ছে। বিষয়টি জানা গেল রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ব গবেষণা কেন্দ্রে গিয়ে। এ কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হামিম রেজাই বিষয়টি জানালেন বেশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে। তিনি য়ামাদেরকে বলেন, এই আমের জাতটি দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। এতে সারাবছরই মানুষ আমের স্বাদ নিতে পারবেন। ড. মো. হামিম রেজা সেরাজুল ইসলামের আম বাগানে দেখাকরেন কিন্তু তাকে পরবর্তিতে কোন প্রকার বিস্তারের ব্যাপারে উদযোগ গ্রহন করেননী।

সিরাজুল ইসলাম কোন প্রকার অভিযোগ করেন্নী । তিনি বলেন আমি এর চাষী আমি এর প্রসার ঘটাবো এতে কেউ এগিয়ে আসুক বা নাই আসুক । উচ্চফলনশীল এ প্রজাতি বছরে তিনবার ফল দেবে। দেশের যে অঞ্চলের মাটিতেই এটি চাষ করা যাবে। এমনকি বাড়ির খোলা জায়গায়, বাসার ছাদে টবের মধ্যেও এটি চাষ করা যাবে। এ জাতের আম গাছ ফল দেবে ডিসেম্বর-জানুয়ারি, এপ্রিল ও জুলাই-আগস্ট মাসে। অর্থাৎ সারাবছরই আম খাওয়া যাবে, যদি কেউ এটি চাষ করেন। বারি-১১ জাতের আমটি খেতে খুবই সুস্বাদু। তবে আঁশ আছে। এটি আকারে লম্বাটে, অনেকটা অংকের ৫ এর মতো দেখতে। প্রতিটি আমের গড় ওজন হয় ৩১৭গ্রাম। কাঁচা আমের ত্বক হালকা সবুজ।

আর পাকলে ত্বক হয় হলুদাভ সুবজ। লম্বায় ১১ দশমিক ৩ সেন্টিমিটার, প্রস্থ ৭ দশমিক ৯ সেন্টিমিটার এবং পুরু ৭ সেন্টিমিটার। আঁটির ওজন ২৫ গ্রাম অর্থাৎ পাতলা আঁটির আমটির ৭৯ ভাগ খাওয়া যায়। মিষ্টতার পরিমাণ ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ টিএসএস। এই গাছে একসঙ্গে পুরোটা জুড়ে মুকুল আসে না। তাই একটি মুকুলের আম যখন পাকার উপযোগী তখন আরেকটিতে আমের আকার মাত্র মার্বেলের মতো হয়।

এতে একটি গাছে এক অংশের আম যখন শেষ হবে তখন অন্য অংশের আম পাকতে শুরু করবে। এভাবে সারাবছর ধরে চলতে থাকবে। ড. হামিম রেজা বলেন, আমরা শিগগিরই এই আমের জাতটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হবো। ড. হামিম রেজার কথা প্রসঙ্গে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান তবে তিনি আশাবাদি যে তার এই আমের প্রসার খুব তাড়াতাড়ি আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়বে ।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় দুই বছর হলো শুরু করা হয়েছে বারোমাসী আম চাষ। উপজেলার খামারকান্দি ইউনিয়নের মাগুড়াতাইর গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল একটি আমবাগান। বাগানটির নাম দেয়া হয়েছে ‘ফুল এগ্রো ফার্ম লিমিটেড’।

শীতকালেও হাতের নাগালে পাওয়া যাচ্ছে আম। এতে উৎসাহিত হয়ে বাগানটি দেখতে প্রতিদিনই ভির করছেন সাধারণ মানুষ।

রোববার সকালে বাগানে গিয়ে দেখা গেছে, আম গাছের কোনো অংশে আমের মুকুল। কোনো অংশে মুকুল থেকে বের হয়ে আসা বোল। আবার বোল থেকে গুটি গুটি আম। কোনো কোনো ডালে পরিপূর্ণ পাকা আম। বাগানে আম ছাড়াও বিভিন্ন প্রকার শীতকালীন সবজি, মাল্টা, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলের চাষও করা হয়েছে।

আমবাগানটি গড়ে তুলেছেন তিনবন্ধু মিলে। হলেন, শহিদুল ইসলাম, মামুনুর রশীদ মামুন ও সোহেল রেজা ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে থাকে।

তারা জানান, চল্লিশ বিঘা জমির উপর মিশ্র ফলের বাগানটি করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ বিঘা জমিতে বারোমাসি আম বারি-১১ ও কাটুমিন জাতের আম চাষ করা হচ্ছে। এর মধ্যে চার বিঘা জমিতে বারি-১১ জাতের আম চাষ করা হচ্ছে।

২০০৫ সালে ছোট পরিসরে নিজেদের পাঁচ বিঘা জমির ওপর ফলের বাগানটি গড়ে তোলা তারা। পরে আরও ৩৫ বিঘা জমি লিজ নিয়ে বাগানটি বড় করা হয়। বাগানে রকমারি ফলের চাষ করা হচ্ছে। দুইবছর হলো সেখানে বারোমাসি আম কাটিমুন ও বারি-১১ চাষ করা হচ্ছে। বর্তমানে তারা বারোমাসি আম বিক্রিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

ফলচাষী শহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে আমরা ৫০০ টাকা কেজি দরে আম বিক্রি করছি। সবকিছু ঠিক থাকলে আমের দাম ভালো পাওয়া যাবে।

তিনবন্ধু যেভাবে হলেন ফলচাষী

শহিদুল, মামুন ও সোহেল তিনজনই কৃষক পরিবারের সন্তান। কৃষি সম্প্রসারণের এক জরিপে দেশসেরা কৃষক নির্বাচিত হন মামুন। এরপর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে নির্বাচিত করে মামুনকে থাইল্যান্ডে ফুড প্রডাকশন ও ম্যানেজমেন্টের ওপর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়।

প্রশিক্ষণ শেষে তিনি দেশে ফিরে এসে মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। আরেক উদ্যোক্তা শহিদুল ইসলাম। তিনি জীবিকার তাগিদে মালয়েশিয়ায় গেলেও ২০০১ সালে দেশে ফেরেন। আর সোহেল বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ) থেকে বারোমাসি আম চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নেন।

পরবর্তিতে তারা যৌথভাবে বিভিন্ন নার্সারী থেকে চারা সংগ্রহ করে ৫ বিঘা জমির ওপর একটি ফলের বাগান তৈরি করেন। সফলতা পাওয়ায় তারা আরও ৩৫ বিঘা জমিতে মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তোলেন। পরে তারা সেখানে বারোমাসি আমের চাষ শুরু করেন।

বারি আম-১১ বারোমাসি জাতের আম অর্থাৎ সারা বছরই ফল দিয়ে থাকে। বছরে তিনবার ফল দেয় এ জাত। নভেম্বর, ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে গাছে মুকুল আসে এবং মার্চ-এপ্রিল, মে-জুন এবং জুলাই-আগস্ট মাসে ফল আহরণের উপযোগী হয়।

ফল লম্বাটে ( লম্বায় ১১.৩ সেন্টিমিটার ) এবং প্রতিটি আমের গড় ওজন ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম। কাঁচা আমের ত্বক হালকা সবুজ। আর পাকলে ত্বক হয় হলুদাভ সুবজ। আম গাছটির উচ্চতা ৬ থেকে ৭ ফুট। গাছটির কোনো অংশে মুকুল, কিছু অংশে আমের গুটি, কিছু অংশে কাঁচা আম, আবার কোথাও পাকা আম। একটি গাছেই ফুটে উঠে আমের ‘জীবনচক্র’। এটি খেতে সুস্বাদু, তবে একটু আঁশ আছে। ফলের শাঁস গাঢ় হলুদ বর্ণের। এই জাতের ৪ থেকে ৫ বছর বয়সী গাছ থেকে প্রতিবার ৬০ থেকে ৭০টি আম আহরণ করা যায়।

এছাড়াও এই জাতের একটি গাছে বছরে প্রায় ৫০ কেজি পর্যন্ত আম হয়ে থাকে। বারি আম-১১ এর এক বছর বয়সী গাছে আমের মুকুল আসে। আম গাছের একটি থোকার মধ্যে ৫ থেকে ৬ টি আম থাকে।

আমের উচ্চফলনশীল এই জাতটি বাংলাদেশের সব এলাকায় চাষ উপযোগী। আমের এই জাতটি সম্পূর্ণ দেশীয়, হাইব্রিড নয়।

মে মাস আমের মৌসুম হওয়ায় এ মাসে আমের ফলন বেশি হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আগস্ট মাসে, তৃতীয় পর্যায়ে নভেম্বর এবং চতুর্থ পর্যায়ে ফেব্রুয়ারি মাসে আম পাকবে।

এছাড়াও দেশে বারি-১১ এর পাশাপাশি থাইল্যান্ডের ‘কাটিমুন’ নামে একটি বারোমাসি আমের চাষ হচ্ছে। বগুড়া শেরপুর উপজেলা ছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জায়গায় এই আমটির চাষাবাদ হয়।

জানতে চাইলে শেরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সারমিন আকতার জানান, খামারকান্দি ইউনিয়নে মাগুড়াতাইর গ্রামে ৪০ বিঘা জমির ওপর মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানকার ফলচাষীদের নিয়মিত পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। কেউ ফলের চারা নিতে যোগাযোগ করলে আমরা তাকে ওই বাগানের পাঠিয়ে দেই। বাগানটি আগে আমাদের মাল্টা প্রদর্শনী প্রজেক্ট ছিল। সেখানে আমাদের কৃষক মামুন মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তুলেছে। সেখানে বারোমাসি আমের চাষ শুরু করে তারা অনেক লাভবান হচ্ছেন।

র্তমানে বাংলাদেশে যতগুলো ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে তার মধ্যে আম অন্যতম। এদেশের মানুষ আম বেশি পছন্দ করে। আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জকে পেছনে ফেলে নতুন রাজধানী হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে নওগাঁর। দেশের মোট উৎপাদিত আমের সিংহ ভাগই আসে নওগাঁ থেকে। যা এতদিন ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের দখলে।এক ফসলি জমিতে ধান চাষের চেয়ে আম চাষ লাভজনক। আর এ কারণেই প্রতি বছর দুই হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আম বাগান গড়ে উঠছে। মাটির বৈশিষ্ট্যগত (এঁটেল মাটি) কারণে নওগাঁর আম সুস্বাদু হওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।এইসব কে সামনে রেখে আগামী মৌসুমে আমের ভাল ফলন পেতে আত্রাইয়ের বাগান মালিকরা আগাম আম বাগানের পরিচর্যা শুরু করেছেন। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই বেশিরভাগ আম গাছে মুকুল চলে আসে। উদ্যানপালন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন থেকেই আমবাগানের বিশেষ পরিচর্যা জরুরি। তা না হলে ফলনে প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে যে আবহাওয়া চলছে, তাতে আম ও লিচুবাগানে জাবপোকার পাশাপাশি ছত্রাকের আক্রমণ হতে পারে। সেইসঙ্গে দেখা দিতে পারে কালো ক্ষত বা অ্যানথ্রাকনোস রোগ। ঠান্ডায় কোল্ড ইনজুরিতেও আক্রান্ত হতে পারে আমগাছ।কুয়াশার কারণে সকালের দিকে পরিবেশে যে ভিজেভাব থাকে, তাতে ছত্রাক জন্ম নেয়। এই ছত্রাককে দমন করতে না পারলে পরবর্তীতে আমের ফলনের ক্ষতি হতে পারে। তবে অনেক কৃষক জাবপোকা ও ছত্রাক দমন করতে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত হারে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করে থাকেন, যাতে গাছের ক্ষতি হয়। পরবর্তী সময়ে রোগপোকা দমনে সুনির্দিষ্ট কীটনাশক আর সেভাবে কাজ করে না।কোল্ড ইনজুরি থেকে আমগাছকে বাঁচাতে পানি স্প্রে করা যেতে পারে। কুয়াশার কারণে ছত্রাকের আক্রমণ রুখতে কিংবা আমগাছে কালোক্ষত বা অ্যানথ্রাকনোস রোগ প্রতিরোধে কার্বেন্ডাজিম ২ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে গুলে স্প্রে করতে হবে। মুকুল আসার মুখে যদি আম ও লিচুগাছে শোষক পোকার আক্রমণ দেখা যায়, তা হলে ইমিডাক্লোরোপ্রিড ১ মিলি প্রতি তিন লিটার পানিতে গুলে আঠা সহযোগে স্প্রে করতে হবে।

মুজিবনগর আম্রকাননসহ জেলার বাগানের আমগাছগুলো মুকুলে ভরে গেছে। মুকুলের মৌ-মৌ গন্ধে ভরে উঠেছে আম বাগানগুলো। তাই বাগানগুলোতে মধু সংগ্রহে মৌ মাছিদেরও ছোটাছুটি শুরু হয়েছে। একইসঙ্গে বেড়েছে আম চাষিদের ব্যস্ততা। এটি এখন মেহেরপুরের মুজিবনগর আ¤্রকাননসহ জেলার আম বাগানগুলোর সাধারণ দৃশ্য। বাগানের মালিকেরা আমগাছে ওষুধ ছিটানোসহ বিভিন্ন ধরণের যত্ন-আত্মি বেড়ে গেছে ।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী মাসের মধ্যভাগ পর্যন্ত প্রতিটি গাছেই পুরোপুরিভাবে মুকুল ফুটে যাবে। বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে এ বছর আমের বাম্পার ফলন হবে বলে আশা করছেন তারা।

কৃষি বিভাগ আরো জানায়, স্বাদের দিক থেকে মেহেরপুরের আম জগত জুড়ে। সুস্বাদু হওয়ায় এ জেলার আমের চাহিদা দেশের সব জেলা ছাড়িয়ে ইউরোপ মহাদেশেও তার সুখ্যাতি ছড়িয়েছে। চাহিদা বৃদ্ধির সাথে-সাথে আমের বাগানও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেহেরপুরের মুজিবনগরে বৃটিশ শাসনামলে তৈরী মুজিবনগর আ¤্রকাননে ১২শ’ আমগাছ আছে। ওই বাগানে ১২শ’ আমগাছ ১২শ’ জাতের। জেলায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সব জাতের আমেরই চাষ হচ্ছে। লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছর কৃষিজমিতে তৈরী করা হচ্ছে আমের বাগান।

 

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ভোমরদহ গ্রামের আমচাষী জাহিদুল হাসান জানান, শীতের তীব্রতা থাকলেও এবার আমগাছে আগাম মুকুল আসতে শুরু করেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার গাছগুলোতে মুকুলের সমারোহ ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে।

সদর উপজেলার গোভীপুর গ্রামের আমচাষী মুকুল বিশ্বাস জানান, বাগানের নিয়মিত যত্ন নিলে অফ ইয়ার বলে কিছু থাকে না। প্রতি বছরই গাছে আম আসবে।

মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ স্বপন কুমার খাঁ জানান, তিনটি পর্যায়ে আমের মুকুল আসে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সব গাছে মুকুলে ভরে যাবে। জেলায় ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। আমচাষের জেলা রাজশাহী হলেও সুস্বাদু আমের জেলা মেহেরপুর। এখানকার মাটির গুণেই হিমসাগর, লেংড়া, বোম্বাই, তিলি বোম্বাই ইত্যাদি জাতের আম খুবই সুস্বাদু। বিশেষ করে নিয়মিত জাত ল্যাংড়া, গোপালভোগ, ক্ষীরসাপাতি, আশ্বিনা জাতের বাগান বেশি থাকলেও গবেষণাকৃত বারি-৩, বারি-৪ জাতের বাগান তৈরির ক্ষেত্রেও আগ্রহী হয়ে উঠছে অনেকে। সেই সঙ্গে নতুন-নতুন বাগান তৈরী হচ্ছে বনেদি ও হাইব্রিট জাতের। নিয়মিত যত্ন নিলে আমের অফ ইয়ার বলে কিছু থাকে না। সূত্র: বাসস

Sunday, 10 January 2021 08:05

বারি-১৩ আম

Written by

বর্তমানে বাংলাদেশে চলছে কৃষি বিপ্লব। দেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা কৃষি গবেষণা প্রযুক্তিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যার দরুন প্রতিনিয়ত উদ্ভাবন করা হচ্ছে নতুন নতুন ফসলের জাত। এরই মধ্যে দেশের বিজ্ঞানীরা আমের বেশ কয়েকটি আমের জাত উদ্ভাবন করেছন। যার মধ্যে রঙ্গিন জাতের একটি আম বারি-১৩ অন্যতম। বারি-১৩ একটি আঁশবিহীন রঙ্গিন জাতের জাম যা উচ্চ ফলনশীল। এছাড়াও এই জাতের আম গড় ওজন ২২০ গ্রামের হয়ে থাকে। ফলে দেশের প্রান্তিক আম চাষিদের কাছে এই আমটি দিন দিন জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে (আম গবেষণা কেন্দ্র) ১৫ বছরের গবেষণার মধ্যে দিয়ে  সাফল্যের মুখ দেখে গবেষক দল। উক্ত আম উদ্ভাবনে নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জমির উদ্দিন । সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় বীজ বোর্ড বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটকে আমটি অবমুক্ত করার অনুমোদন দিয়েছে।

২০০৫ সালে বারি আম-৩, অর্থাৎ আম্রপালি ও যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে সংগ্রহ করা রঙিন আম পালমারের মধ্যে সংকরায়নের মাধ্যমে আমটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। আম্রপালিকে মা ও পালমারকে বাবা ধরে সংকরায়ণ করে Hy-059 লাইন সৃষ্টি করা হয়।

নতুন এ জাতের আম লম্বাটে ও মাঝারি আকৃতির হয়, গড় ওজন ২২০ গ্রাম, সবচেয়ে বড় বিষয় এটি নাবী জাতের , উচ্চ ফলনশীল ও নিয়মিত ফল দেয়, শেষ জুলাই থেকে আগষ্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ এ আম সংগ্রহ করা যায়, পরিপক্ক সংগৃহিত আম সাধারণ তাপমাত্রায় ৮দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। এ আমের ভক্ষণযোগ্য অংশ শতকরা ৭৪.৬৭ ভাগ, মিষ্টতা শতকরা ২১ ভাগ।

 

আমের দেশ হিসেবেই পরিচিত বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চল। তবে বরেন্দ্রর চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিরা সাম্প্রতিককালে আমের পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে মাল্টা, পেয়ারা ও ড্রাগনের চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। সেই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে মতিউর রহমান নামের এক কৃষক কমলার চাষ শুরু করেন! বরেন্দ্রর রুক্ষ লাল মাটিতে যা কয়েকবছর আগেও কৃষকদের কাছে ছিল স্বপ্নের মত। কিন্তু কমলা চাষে মতিউর রহমানের চোখ ধাঁধানো সাফল্য যেন সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে!

কম খরচে অতুলনীয় স্বাদ ও ঘ্রাণের কমলা উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষের স্বপ্ন দেখছেন। কৃষি বিভাগ বলছে, আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণ অনুকূলে থাকায় এই এলাকায় কমলা চাষে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। 

মতিউর রহমানের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সবুজ পাতার ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে অসংখ্য হলুদ ফল। তার বাগানের প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে কাঁচা-পাকা কমলা। এটি নিঃসন্দেহে যে কারো দৃষ্টি কাড়বে। মাল্টার পর এবার কমলা ফলিয়ে রীতিমত বিপ্লব ঘটিয়েছেন এই কৃষক। এর আগে তার হাত ধরেই বরেন্দ্র ভূমিতে মাল্টার বিপ্লব ঘটে।

মতিউরের কমলা বাগান। ঢাকা ট্রিবিউন

মাল্টার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ৪ বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঝিলিম ইউনিয়নের জামতাড়া এলাকায় তার ১৬ বিঘার মিশ্র ফল বাগানে ২০ প্রজাতির কমলা নিয়ে কাজ শুরু করেন বৃক্ষ রোপণে জাতীয় পুরষ্কার পাওয়া এই ফল চাষি। কিন্তু সফলতা পান যুক্তরাষ্ট্রের মেন্ডারিন, চায়না, দার্জিলিং ও অস্ট্রেলিয়া এই চার জাতের কমলায়। বর্তমানে তার বাগানে গাছের সংখ্যা ৫৫০টি। এবার প্রতিটি গাছেই ফল ধরেছে আশাতীত। গাছ রোপণের দ্বিতীয় বছরেই ফল পেলেও; কাঙ্খিত সাফল্য পান চার বছরের মাথায়।

সফল কমলাচাষি মতিউর রহমান ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, এবার প্রতিটি গাছে গড়ে ফলন পেয়েছেন ৩০ থেকে ৪০ কেজি। বাগান থেকে প্রতিকেজি কমলা বিক্রি করছেন ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়। গত বছর কমলা থেকে আয় হয়েছিল ২ লাখ টাকা; এবার ৫ লাখের আশা করছেন তিনি। ইতোমধ্যে তিনি কমলার প্রায় ২০ হাজার চারা বিক্রি করেছেন। এ বছর টার্গেট ৫০ হাজার চারা তৈরির। আর আকারভেদে এসব চারার দাম ১০০ থেকে ২৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। এ চারা দিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ সারাদেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠবে মাল্টার মতই বাণিজ্যিক কমলার বাগান।

মতিউর রহমান বলেন, “আমার মত নতুন উদ্যোক্তারাও বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষে মাল্টার মতই লাভবান হবেন।”  

এদিকে, তার সফলতা দেখে জেলায় এখন অনেকেই শুরু করেছেন বাণিজ্যিক কমলার চাষ। আর এ ফল চাষে সরকারি সহায়তা চান বরেন্দ্র অঞ্চলের ফল বাগানিরা।  সফল ফল চাষি রফিকুল ইসলাম জানান, “আমি ৮৪০ বিঘার ফলের প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছি। যেখানে পেয়ারা, মাল্টা, ড্রাগন, ১৮ জাতের আম, সফেদা, পার্সিমনসহ বিভিন্ন জাতের ফলের চাষ করছি। পাশাপাশি দেশি বিলুপ্ত প্রায় ফল নিয়েও আমরা গবেষণা কার্যক্রম এবং সম্প্রসারণে কাজ করছি। এবার আমার ফলের প্রজেক্টে নতুন সংযোজন করেছি কমলা চাষও। মতিউর ভাইয়ের সফলতায় আমি মুগ্ধ হয়ে তার কাছ থেকে কলম চারা সংগ্রহ করে ৭০ বিঘা জমিতে কমলার বাগান গড়ে তুলেছি। এখন আমার গাছের বয়স পাঁচমাস। আশা করছি সমানের বছর আমিও ফল পাব এবং সফল হব।”

 

সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (গবেষণা) কমলা রঞ্জন দাসও এই কমলা বাগান পরিদর্শন করেছেন এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের এই ভূমিতে উদ্যোক্তা চাষি মতিউর রহমান কমলা ফলিয়ে রীতিমত বিপ্লব ঘটিয়েছেন এমন মন্তব্য করেন তিনি। শুধু তাই নয় স্থানীয় প্রশাসনও পরিদর্শন করেছেন এই কমলা বাগান এবং মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন মতিউরের কমলা চাষের সফলতায়। কমলা বাগান দেখতে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তার কমলা বাগান দেখতে আসছেন অনেক উদ্যোক্তা ও চাষি। 

কথা হয় কমলার বাগান দেখতে আসা হাসিব হোসেন নামে এক যুবকের সাথে। তিনি বলেন, “কমলার টানে মতিউর ভাইয়ের বাগান দেখতে এসেছি। থোকায় থোকায় কমলা দেখে আমি অভিভূত। বাগান থেকে কমলা পেড়ে খেলাম। যা কখনোই ভাবিনি। এর স্বাদ ও মিষ্টতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। সবমিলিয়ে আলাদা ধরনের এক অনুভূতি। আমি মনে করি এই ধরনের উদ্যোগগুলোকে সব পর্যায় থেকে সহায়তা করা উচিত। এতে যারা উদ্যোক্তা রয়েছে তারা অনুপ্রাণিত হবে। মতিউরের এই সাফল্য সত্যিই প্রশংসনীয়। এই উদ্যোগগুলো বেঁচে থাকুক এই প্রত্যাশা করছি।”

“তবে এই ফল চাষের কিছু সমস্যাও রয়েছে। গাছে মাকড়ের আক্রমণ এবং ফল আসলে ফ্রুটফ্লাইয়ের উপদ্রব দেখা দেয়। যা দমনে বাড়তি সর্তকতার পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের জন্য দরকার ফল কার্যকর গবেষণা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা”, বলেন চাষি মতিউর রহমান।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, পোকামাকড় বড় ধরনের কোনো সমস্যা নয়। সেক্ষেত্রে এবামেকটিন গ্রুপের ইনসেক্টিসাইড সিডিউল স্প্রে করলে এটা দমন করা সম্ভব এবং ফ্রুটফ্লাইয়ের ক্ষেত্রে ফ্রুট ব্যাগিং, পাশাপাশি অন্যান্য যেসব প্রযুক্তি আছে বায়োলজিক্যাল; সেগুলো ব্যবহার করলে এবং সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করলে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। চাষিরা সজাগ থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ ও বিজ্ঞানীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করলে চাষিরা ভালো প্রযুক্তি পাবে এবং উৎপাদনে কোনো ব্যাঘাত হবে না। তবে স্থায়ী সমাধানে এবং ফ্রুটফ্লাই দমনে আরও কার্যকর গবেষণার দরকার আছে বলেও মনে করেন ফল গবেষকরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের জার্মপ্লাজম অফিসার জহুরুল ইসলাম বলেন, “এ অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া ও জলবায়ু কমলা চাষের জন্য উপযোগী। তাই মাল্টার মতো এই ফলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদী আমরা। এটি জেলায় ভালো হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে আমরা মতিউর রহমানের উৎপাদিত কমলা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি। গত বছর আমাদের ল্যাবে বিদেশি আমদানিকৃত কমলা এবং এখানকার উৎপাদিত কমলা পরীক্ষা করেছি। সেখানে দেখা গেছে আমদানিকৃত কমলার চেয়ে এখানকার উৎপাদিত কমলা কোনও অংশেই কম নয়। খোসা পাতলা। সহজেই ছাড়ানো যায় এবং ভেতরের কোয়াও বেশ সুন্দর। এটি খেতে সুস্বাদু এবং মিষ্টতাও বেশ ভালো।”

এই ফল গবেষক আরও জানান, দেশে নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই সময়ে ভালো মানের দেশি ফলের প্রাপ্যতা অনেক কম; সেদিকে দৃষ্টি দিলে চাষিরা কমলা চাষ করলে বিদেশি এই ফলের আমদানি নির্ভরশীলতা অনেকটা কমে আসবে এবং বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষে লাভবান হবে। তবে ভালো বাগান গড়ে তুলতে মাতৃগাছের কলম চারা রোপণের পরামর্শ এই ফল গবেষকের।

আর কৃষি বিভাগ বলছে, এ ধরনের ফল উৎপাদনে কৃষকদেরকে সহযোগিতা করে আসছে কৃষি বিভাগ। সরকারিভাবে এই ফলের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণে গ্রহণ করা হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনাও। 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ নজরুল ইসলাম বলেন, “এখানকার কৃষকরা কমলা চাষের যে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন, তাতে আগামী দিনে এই বরেন্দ্র ভূমিতে মাল্টার মতো কমলাতেও আমরা সফল হব। আর এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য উৎসাহী ও উদ্যোক্তা চাষিদের আমরা টেকনিক্যাল সাপোর্ট, প্রশিক্ষণ, পাশাপাশি ভালো চারা পেতে সহায়তা করছি। শুধু তাই নয়, আমরা সরকারের প্রকল্পের মাধ্যমেও কমলা চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছি প্রতিটি উপজেলায়। আমরা আশা করছি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মাল্টার মতো কমলা চাষ সম্প্রসারণেও সফল হব।”

 

নিউজটি আমাদের নিজস্ব না। আমের এই বিশেষ খবরটি সবার কাছে সহজলোভ্য করার জন্য নিউজিট এখানে প্রকাশ করা হয়েছে। নি্‌উজিটর সকল কৃতিত্ব ও স্বত্ত শুধুমাত্র  https://www.rajshahipost.com

Page 1 of 47