x 
Empty Product

বাজারে যখন কার্বাইড, ফরমালিন আর কেমিকেলের ছড়াছড়ি তখন অর্গানিক আম নিয়ে রীতিমত যুদ্ধেই নেমেছেন একজন আইনজীবী। আর এ যুদ্ধ কোনো আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে নয়, বরং নিজস্ব ৪০ বিঘা জমিতে আম বাগান করে অর্গানিক আমের প্রতি আগ্রহী ক্রেতাদের মধ্যে সরবরাহের মাধ্যমে বিষমুক্ত আম খাওয়াবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন তিনি। ইতোমধ্যেই দিঘলিয়ার ‘উকিল সাহেবের আম বাগান’ নামে পরিচিত সবুজ উদ্যান দেশে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। অর্গানিক আম বাগানের মূল উদ্যোক্তা এডভোকেট শেখ শাহাদাত আলীর পাশে সার্বক্ষনিক রয়েছেন তার স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর রওশন আকতার। যিনি সম্প্রতি খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে অবসরগ্রহণ করে স্বামীর সাথে আম বাগানেই সময় দিচ্ছেন। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে যে আম বাগানটির পরিচর্যা করছেন সেখানে মওসুমে রীতিমত দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। এজন্য তারা সেখানে একটি পর্যটনকেন্দ্রও গড়ে তুলতে চাইছেন। রয়েছে একটি পিকনিক স্পটও। যেখানে ছোট্ট পরিসরে পিকনিক করা ছাড়াও বৃক্ষপ্রেমিক কিছু মানুষকে নিয়ে বিনোদনের সুযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি ওই আম বাগান পরিদর্শনকালে দেখা যায়, বিগত ২০দিন আগে থেকেই হিমসাগর আম পাড়া শুরু হয়েছে। দু’দিন আগে থেকে শুরু হয়েছে ল্যাংড়া আম পাড়া। বর্তমানে মল্লিকা ও আম্রপালী পাকা শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন এডভোকেট শেখ শাহাদাত আলী। এছাড়াও ৪০ বিঘার ওই আম বাগানে আছে ম্যাটাডোর(থাই), কাটিমোন ও পৌড়মতি আম।

সরাসরি ক্রেতারা গিয়ে যেমন ওই বাগান থেকে গাছপাকা আম কিনতে পারছেন তেমনি মোবাইল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অর্ডার নিয়েও আমগুলো পাঠানো হচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। সরাসরি বাগান থেকে আম কিনলে হিমসাগরের কেজি পড়ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা করে এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য স্থানে পাঠাতে গিয়ে আমের কেজি পড়ে যাচ্ছে একশ’ থেকে ১২০টাকা পর্যন্ত।

এডভোকেট শাহাদাত আলী বলেন, যেহেতু এটি অর্গানিক আম এবং কোন প্রকার কেমিকেল ব্যবহার করা হচ্ছে না, সেহেতু এর উৎপাদন খরচ একটু বেশি পড়ছে।

পোকা দমনে সেক্স ফ্রেমন ট্যাব ছাড়াও তাইওয়ান থেকে আনা ইয়োলো কার্ড নামে এক প্রকার আঠা জাতীয় পেপার ব্যবহার করা হয়। যেগুলো অনেক উচ্চমূল্য পড়ছে বলে আমের মূল্যও বেশি পড়ে গেছে।

এছাড়া এবার ফনিসহ অন্যান্য কয়েকটি ঝড়ে বেশকিছু আম পড়ে গেছে। তার এবারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল অন্তত: এক হাজার মন আম উৎপাদনের। কিন্তু কিছু ঝড়ে পড়ে যাওয়ায় সাত থেকে ৮শ’ মন হতে পারে। ৪০ বিঘা জমিতে সর্বমোট ৬শ’ আম গাছ রয়েছে ওই সবুজ উদ্যানে।

আম ছাড়াও প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আমের চাড়া সরবরাহ করা হয় ওই বাগান থেকে। ওই বাগানটি নিছক একটি আম বাগানই নয়, বরং এখানে রয়েছে গবেষণার সুযোগ। সেই সাথে মার্কেটিং ও মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এডভোকেট শাহাদাত আলীর পরামর্শ নিয়ে দিঘলিয়ার অনেকেই আম বাগান করে আজ স্বাবলম্বী হয়েছেন। এডভোকেট শাহাদাত আলী বিগত ৪০ বছর ধরে আম চাষ করছেন উল্লেখ করে বলেন, তার বাগানে কয়েকটি স্থানীয় জাতের আমগাছ ছিল অনেক বয়সের। যেগুলোকে তিনি জাতের আমে পরিণত করেছেন। এজন্য প্রথমে স্থানীয় জাতের গাছগুলোর ডাল কেটে দিয়ে পরে বর্ধিত অংশে জাতের আমের ডাল দিয়ে কলম বাধা হয়। যেসব গাছে এখন বিপুল পরিমাণ আম শোভা পাচ্ছে।

এডভোকেট শাহাদাৎ আলীর স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর রওশন আকতার বলেন, ভাল আমগুলো বিক্রির পাশাপাশি বাতিল (সামান্য ছিলে যাওয়া) আমগুলো দিয়ে আমসত্ব তৈরি করা হয়। যা অনেক দিন সংরক্ষণ করে রাখা যায়।

দিঘলিয়া উপজেলার দেয়াড়া পূর্বপাড়ায় অবস্থিত ওই আম বাগানকে ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলতেও নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। ইতোমধ্যে সেখানের পুকুরে আনা হয়েছে ছোট্ট প্লাষ্টিক বোর্ড। যেটি একদিকে যেমন পুকুর পাড়ের গাছের আম পাড়ার কাজে ব্যবহৃত হয় অপরদিকে পর্যটকদের পুকুর ভ্রমণেও কাজে লাগে।

হাতের স্পর্শ ছাড়া আম পাড়ার ব্যাপারেও প্রফেসর রওশন আকতার উদ্ভাবন করেছেন এক নতুন প্রযুক্তি। লম্বা লাঠির এক মাথায় নেট দিয়ে তার সাথে কাপড় মুড়িয়ে লম্বা করে নিচ পর্যন্ত নামিয়ে এমনভাবে আম পাড়া হবে যাতে আমটি কোনভাবেই মাটিতে পড়ে আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। এভাবে আম নিয়ে নিত্যনতুন গবেষণা আর কৌশল আবিষ্কার করছেন দিঘলিয়ার এই দম্পতি।

দিঘলিয়ার সবুজ উদ্যান সম্পর্কে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (আম গবেষণা) ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, এক সময় মানুষ জানত শুধু রাজশাহীই আমের রাজধানী। কিন্তু খুলনার দিঘলিয়ার এডভোকেট শাহাদাত আলী প্রমাণ করলেন লবণাক্ত এলাকায়ও পরিকল্পিতভাবে বাগান করলে আম উৎপাদন করা সম্ভব। বিশেষ করে অর্গানিক আমের ক্ষেত্রে দিঘলিয়ার সবুজ উদ্যানটি হতে পারে দেশের জন্য একটি মডেল। তার মত একজন কৃষককে অনুসরণ করলে অন্যান্য কৃষকরাও সফল হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হাফিজ আল-আসাদ বলেন, এমন একটি উদ্যোগকে সবারই সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত। কেননা, বিষমুক্ত আম উৎপাদনে এ ধরনের উদ্যোগই প্রয়োজন। তাছাড়া এমন একজন কৃষককে অনুসরণের মধ্যদিয়ে দেশে কৃষি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপ-পরিচালক পংকজ কান্তি মজুমদার বলেন, আম হচ্ছে ফলের রাজা। এক সময় দেশে স্থানীয় জাতের আম ছিল। যার ফলন যেমন ছিল কম তেমনি মিষ্টিও কম ছিল। কিন্তু এখন বাজারে বিভিন্ন জাতের আম এসেছে। যার স্বাদ ও ঘ্রাণ যেমন বেশি তেমনি আকার-আকৃতিও বড়। সব মিলিয়ে বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে দিঘলিয়ার সবুজ উদ্যানটি গড়ে উঠেছে।

একটি পরিসংখ্যানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১০ সালের পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সারাদেশে আমের ফলন প্রায় দ্বিগুন বেড়েছে। সেই সাথে আম খাওয়ার প্রতিও মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এটি অবশ্যই একটি ভাল দিক। এক সময় কৃষি বিভাগই আম্রপালি চাষ শুরু করে। যা আজ দেশব্যাপী সমাদৃত। এখন বারো মাসি আম বারি-১১ এবং আশ্বিনার সাথে ক্রস করে বারি-৪ জাতের আম চাষের প্রতি উদ্বুদ্ধ করছে কৃষি বিভাগ। এটি হলে সারা বছরই আম পাওয়া যাবে।

পোকা দমনের ক্ষেত্রে তিনি সেক্স ফ্রেমন ট্যাব ও ইয়োলো কার্ডের পাশাপাশি ব্যাগিং পদ্ধতির কথা তুলে ধরে বলেন, এতে একদিকে যেমন পোকা থাকবে না অপরদিকে আমের রংও ভাল হবে। যদিও এতে খরচ একটু বেশি পড়বে। আম চাষের এসব প্রতিটি অর্গানিক পদ্ধতিই দিঘলিয়ার সবুজ উদ্যানে ব্যবহার করা হয় বলেও তিনি সেটি পরিদর্শনকালে দেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন।

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে জনপ্রিয় হচ্ছে অর্গানিক পদ্ধতিতে আম উৎপাদন। কিছু প্রতিষ্ঠান কোন রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই এ পদ্ধতিতে আম উৎপাদন করছে। আবার  অনলাইনে বুকিং এর মাধ্যমে ভোক্তার কাছে পৌছে দেয়ার ব্যবস্থাও রেখেছে তারা।

২০১০ সাল থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে ৬৫ বিঘার মোট ৫টি বাগান গড়ে তুলেছেন কিন-ইয়ার্ডস উদ্যোক্তারা। যেগুলোতে হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি জাতের আম উৎপাদনে রাসায়নিক সার তো নয়ই, ব্যবহার করা হয়না বালাইনাশকও।

পরিচর্যাকারীরা বলছেন, পোকা দমনে সাবান পানি, ফেরোমন ফাঁদ, আলোর ফাঁদ ও নিমপাতার রস ব্যবহার করা হয়। আর রাসয়নিকের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় জৈব সার।

উদ্যোক্তারা বলছে, ভোক্তার কাছে বিষমুক্ত আম পৌঁছে দিতেই এই উদ্যোগ। অনলাইনে বুকিং নিয়ে সময় মতো কুরিয়ারের মাধ্যমে মাত্র তিন দিনের মধ্যে পৌঁছে দেয়া হয় এই আম। এ বছর আম পৌঁছানো শুরু হবে ৫ জুন থেকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ছে। ফলে মান ঠিক রেখে এভাবে আম উৎপাদন করলে দেশে তো বটেই, বিদেশেও বাংলাদেশের অর্গানিক আমের বড় বাজার তৈরি হবে।

রাজশাহী জেলায় এ বছর সাড়ে ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৬৬৪ মেট্রিকটন। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় লক্ষ্যমাত্রা আড়াই লাখেরও বেশি। যার মধ্যে অর্গানিক আম উৎপাদনের হার খুবই সামান্য।

আম বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ফল। এই উপমহাদেশেই আমের শতকরা সত্তর ভাগ জন্মে থাকে। বাংলাদেশের সর্বত্র আম গাছ দেখা যায়। তবে সবচেয়ে ভাল আম পাওয়া যায় উত্তরবঙ্গে। পোপেনো(১৯৬৪) আমকে ‘প্রাচ্য দেশের ফলের রাজা’ রূপে সম্বোন্ধন করেছেন। মুঘল সম্রাট আকবর দারভাঙ্গার নিকট একটি বাগানে এক লক্ষ আম গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করে সেই স্থানের নাম দিয়েছিলেন ‘লাখ-বাগ’। কবি আমির খসরু চতুর্দশ শতাব্দীতে তার কবিতায় আমকে হিন্দুস্থানের সেরা ফল হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ইতিহাস

কারো কারো মতে ভারত উপমহাদেশেই এর উৎপত্তি। প্রায় চার হাজার পূর্বেও আম গাছ ছিল বলে জানা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাংলাদেশ, আসাম, ব্রহ্মদেশ এবং মালয় এলাকা আমের পুরনো নিবাস বলে দাবী করা হয়। আলকজান্ডার ভারত আক্রমণকালে খ্রীস্টপূর্ব ২২৭ অব্দের দিকে সিন্ধু অববাহিকায়; ১৩৩১ খ্রিস্টাব্দে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে আমগাছ দেখা গেছে। ষষ্ঠদশ শতাব্দীর মধ্যে পারস্য উপসাগরে এবং সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যে ফিলিপাইন, কুইন্সল্যান্ড, হাওয়াই প্রভৃতি স্থানে আম পৌঁছে গিয়েছিল।
 

আমের জাত

বাংলাদেশে আমের অনেকরকম জাতের চাষ করা হয়। সুস্বাদু আমের একমাত্র যোগানদাতাই উত্তরবঙ্গ। বিভিন্ন জাতের আমের মধ্যে পার্থক্য আকৃতি, স্বাদ ও পাকার সময়ের ভিত্তি করে করা হয়। বাংলাদেশের কয়েকটি সুপরিচিত জাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ফজলী, ল্যাঙড়া, গোপালভোগ, কিষাণভোগ, হিমসাগর, কহিতুর, ক্ষীরসাপাতি,  মোহনভোগ, শ্রীধন, বৃন্দাবনী, মালগোভা, আনোয়ার রেতাউল, ফজরীকলন, মিঠুয়া, দু-সেহরী, পিয়ারী, আলফান্সো, দুধিয়া, বোম্বাই, বারমাসী, কাঁচা মিঠা প্রভৃতি। ক্ষীরসাপাতি বাংলাদেশের জেনেটিক্যাল আমের জাত। এটি শুধু বাংলাদেশেই পাওয়া যায় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

ছাদে চাষ উপযোগী আমের জাত

সুস্বাদু আম শুধু উত্তরবঙ্গেই পাওয়া গেলেও এখন আমের বিভিন্ন হাইব্রীড জাত আমাদের বাসার ছাদেও চাষ করা যায়। অনেকেই শখের বসে ছাদে বড় ড্রাম বা টবে আম চাষ করে থাকেন।  সব জাতের আমই ছাদে চাষ করা যায়। তবে ছাদে সবচেয়ে ভাল হয় বারি আম-৩ জাতটি। ছোট আকৃতি গাছ, মাঝারি সাইজের ফল ও খেতে বেশ সুস্বাদু। এর আরেক নাম আম্রপালি। মোটামুটি প্রতিবছরই এই জাতের আম ফলন দেয়। তাছাড়াও বাউ আম – ১, ২, ৩, ৬, ৭, লতা বোম্বাই ইত্যাদি বামন জাতের আম ছাদের জন্য বেশ উপযোগী।
 

টবের আকৃতি

ছাদে টবে আম চাষ করতে বিশেষ যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন হয়। টবে আম চাষ পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবে আম চাষের পদ্ধতির চেয়ে অনেকড়াই ভিন্ন। ছাদে তিনরকম সাইজের টবে আম চাষ সম্ভব।
১. ফেলে দেওয়া অর্ধ বা সম্পূর্ণ ড্রাম
২. সিমেন্টের তৈরি টব, যা ব্যাস ৭৫ সেন্টিমিটার ও উচ্চতা ১.২৫ মিটার
৩. ইট-সিমেন্টের তৈরি দেড় মিটার লম্বা, চওড়া ও উচ্চতা সম্পন্ন টব

মাটি তৈরির পদ্ধতি

ছাদে আমের কলমের চারা লাগানোর জন্য উপরোক্ত যেকোনো সাইজের ড্রাম বা টবে তলায় ৩-৫ টি ছিদ্র করে নিতে হবে যেন গাছের গোড়ায় পানি জমতে না পারে। পুরনো মাটির টব বা ইট ভেঙ্গে টবের তলার ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। এবার ২ ভাগ দোআঁশ মাটি, ১ ভাগ গোবর, ৪০-৫০ গ্রাম টিএসপি সার, ৪০-৫০ গ্রাম পটাশ সার, ১ কেজি কাঠের ছাই, ১ কেজি মৃত প্রাণির হাড়ের গুড়া ও হাফ কেজি সরিষার খৈল একত্রে মিশিয়ে ড্রাম বা টব ভরে পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। এভাবে যেতে দিতে হবে ১৫ দিন। অতঃপর মাটি ওলটপালট করে দিয়ে আরও ৪-৫ দিন এভাবেই রেখে দিতে হবে।

চারা রোপন পদ্ধতি

মে-জুন মাসে চারা রোপন করা ভাল। মাটি কিছুটা ঝুরঝুরে হলে একটি সুস্থ সবল কলমের চারা উক্ত টবে রোপন করতে হবে।  চারা গাছটিকে সোজা করে লাগাতে হবে। প্রয়োজনে কোনো লাঠি দিয়ে গাছের কান্ড ঠেস দিয়ে রাখতে হবে। সেই সাথে গাছের গোড়ায় মাটি কিছুটা উচু করে দিতে হবে এবং মাটি হাত দিয়ে চেপে চেপে দিতে হবে যেন গাছের গোড়া দিয়ে বেশী পানি না ঢুকতে পারে। চারা লাগানোর পর প্রথমদিকে পানি কম দিতে হয়। আস্তে আস্তে পানির পরিমাণ বাড়াতে হবে। টবের গাছটিকে এমন জায়গায় রাখতে হবে যাতে প্রায় সারাদিন রোদ লাগে।

টবে আম গাছের যত্ন ও সার প্রয়োগ

একটি সদ্য লাগানো আম গাছে বছরে দুইবার সার প্রয়োগ করতে হয়। প্রথমবার জুন মাসে এবং দ্বিতীয় বার অক্টোবর-নভেম্বর মাসে। গাছের মুকুল আসার কমপক্ষে তিন মাস আগ থেকে নাইট্রোজেন জাতীয় সার ব্যবহার করা যাবে না।
টবের আমগাছে কোন ধরনের রাসায়নিক সার ব্যবহার না করে জৈব সার ব্যবহার করায় সবচেয়ে ভালো। এতে মাটির গুণাগুণ বজায় থাকবে। কারণ একবার আম গাছ লাগিয়ে দেয়ার পর মাটি আর পরিবর্তন করা যায় না। জৈব সার হিসেবে পচা গোবর এবং সরিষার খৈল ব্যবহার করতে হবে। এই সার ব্যবহারের জন্য ২৪ ঘন্টা বা সম্পূর্ণ দিন ভিজিয়ে রেখে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে‌‌।

টবে আম চাষে পানি সেচ

টবে আম চাষের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের চেয়ে পানির চাহিদা বেশি থাকে। এজন্য প্রায় প্রতিদিনই টবে আম গাছকে পানি সরবরাহ করতে হবে। এছাড়া ফুল আসার পর পানির অভাব যাতে না হয় সেই ব্যবস্থা করতে টবের নিচে জলকান্দা রাখতে হবে। সিমেন্ট বা ইটের টবে যেহেতু নাড়াচাড়া করার ব্যবস্থা নেই, সেহেতু সকাল-বিকাল দুইবার পানি দিতে হবে। সঠিকভাবে পানির অভাব পূরণ হলে গাছে ফল ঝরা বন্ধ হয় এবং ফলন বৃদ্ধি পায়।
 

আম গাছে কীটনাশক প্রয়োগ

আম গাছে পোকার আক্রমণ দেখা দিলে Ripcord অথবা desis প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম করে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে গাছের বর্তমানে এক ধরনের সাদা তুলোর মতো পোকা দেখা যায় যা অনেকে ফাঙ্গাস বলে কিন্তু তা আসলে ফাঙ্গাস মানে আসলে এটা এক ধরনের পোকা যা গাছে লাগলে গাছ মারা যেতে পারে। এই পোকা দমনের একমাত্র এবং সহজ উপায় হলো যত বেশি পারা যায় গাছে পানি ছিটানো এবং গাছের পাতা ও কান্ড আমি যে তুলে দেওয়া প্রয়োজনে প্রতি ১ লিটার পানিতে এক গ্ৰাম পরিমাণে ডেসিস ও এ‍্যাডসায়ার মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

আম গাছে মুকুল আসার আগে করণীয়

নভেম্বর নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে মাঝামাঝি সময়ে প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম দস্তা, ১.৫ গ্রাম বোরন, ২ গ্ৰাম ভেজিম্যাক্স একত্রে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এতে করে ফলের আকার ভালো থাকবে এবং ফল ফাটবে না।

আম গাছে মুকুল আসার পর করনীয়

আমের মুকুল যখন গুটি বের করা শুরু করবে তখন প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম ডেসিস, দুই গ্ৰাম ডায়োথেন ৪৫ এমজি ও ২ গ্ৰাম ভেজিম্যাক্স মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এই ওষুধ গুলো পোকা দমন ও আমের সঠিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

ফলের বিশেষ যত্ন

ছাদবাগানে চাষ করা আম বড় হওয়া শুরু করলে গাছ নুইয়ে যেতে পারেম এছাড়া প্রমাণ সাইজ আম হওয়ার পূর্বেই আমের বোঁটা দূর্বল হয়ে ঝড়ে যেতে পারে। এতে করে আমের ফলন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেজন্যে আম ধরার সাথে সাথে গাছে অতিরিক্ত অবলম্বন দিয়ে কান্ড শক্ত করে বেধে দিতে হবে। আমের সাইজ একটু বাড়ন্ত হলেই বায়োডিগ্রেডেবল পলিথিন দিয়ে ফলগুলোকে মুড়িয়ে রশি দিয়ে অন্য কোনো অবলম্বনের সাথে জুড়ে দিতে হবে। এতে আম বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ পাবে।

ফল সংগ্রহ

সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে আম গাছে মুকুল দেখা যায়। এর দুই তিনমাস পরে ফল পাকে। ছাদে চাষ করা আম ১-২ বছরের মধ্যেই ফল দেওয়া শুরু করে। বাগানে লাগানো কলমের আম ৩-৪ বছর বয়সে ফল দেওয়া শুরু করলেও দশ বছরের পূর্বে উপযুক্ত পরিমাণে ফল দেয় না এরা। ছাদবাগানে লাগানো ছোট জাতের আম গাছে সর্বোচ্চ ৫০-৬০ টি উপযুক্ত আকৃতির ফল পাওয়া সম্ভব। পড়শীদের আপনার ছাদবাগানে জন্মানো আম খাওয়াতে চাইলে রঙ ধরেছে এমন বাত্তি আম পাড়াই শ্রেয়।

স্বল্প মেয়াদী ফসল সবজি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে রাসায়নিক সার ব্যতিরেকে ব্যবসায়ীক উৎপাদন কিছুটা কঠিন হলেও দীর্ঘমেয়াদী সুস্থির কৃষির লক্ষ্যে ফলবাগানকে জৈব বাগান হিসেবে সহজেই গড়ে তোলা যেতে পারে।

যে জমিতে ফল বাগান করা হবে তাতে বিঘা প্রতি ২০ কুইন্টাল গোবরসার বা ১০ কুইন্টাল কেঁচোসারের সঙ্গে ট্রাইকোডার্মা + নিমখোল বা দানা ( সুপারিশ অনুযায়ী) দিয়ে গভীর চাষ দিলে ভালো। না পারলে যতটা পারবেন করবেন। চাষ জমি হলে আগে ডালশষ্য জৈব উপায়ে চাষ করে নেবেন।

আম চাষের জৈব প্যাকেজ –

    • দেশি জাতের জন্য ১০ মিটার x ১০ মিটার ও হাইব্রিড জাতের জন্য ৫ মিটার x ৫ মিটার ২.৫ কেজি নিমখোল বা নিম দানা ২০০ গ্রাম + ৫০ গ্রাম ভালো সয়েল কন্ডিশনার বা হিউমিক অ্যাসিড + ৫০ গ্রাম জীবানু সার দিয়ে গাছ বসাতে হবে।
    • গাছের পাতা – ডাল নিয়ন্ত্রণে রেখে হিউমিক অ্যাসিড ও গ্রোথ এনহ্যান্সার স্প্রে ।
    • বাগানের মাঝে শীতকালীন সবজি বিশেষত: শুঁটিজাতীয় ও অন্য মরশুমে ডালশষ্য চাষ।
    • বাগানের চারদিকে জৈব বেড়া লেবু / করমচা গাছের গড়ে তোলার সঙ্গে ফল আসতে শুরু করলে ফলের মাছির ফেরোমন ফাঁদ লাগানো ও মৌমাছি চাষ।
    • সার ব্যবস্থাপনা – বর্ষার আগে ও বর্ষার পর চারদিকে রিং নালা করে দেবেন দু ভাগে।

প্রথম বছর – গোবর সার ২৫ কেজি বা কেঁচোসার ১০ কেজি + ২ কেজি সরষে বা নিমখোল, ৫০ গ্রাম জীবানুসার, ৫০ গ্রাম হিউমিক অ্যাসিড, জৈবউৎসেচক দানা ৫০ গ্রাম , এসবের সঙ্গে ১০০ গ্রাম ট্রাইকোডার্মা। এই সার প্রতি বছর সামান্য করে বাড়িয়ে প্রয়োগ করতে হবে।

১০ বছর থেকে গোবর সার ২০ কেজি বা কেঁচোসার ৫ কেজি + ২ কেজি সরষে বা নিমখোল, ১০০ গ্রাম জীবানুসার, ১০০ গ্রাম হিউমিক অ্যাসিড, জৈবউৎসেচক দানা ১০০ গ্রাম , এসবের সঙ্গে ১০০ গ্রাম ট্রাইকোডার্মা।

লিচু চাষের ক্ষেত্রে আমের মতোই তবে চারা বসানোর সময় ২ কেজি পুরোনো লিচুর মাটি দিন।

উপযুক্ত জমিও মাটি
উর্বর দোআঁশ উঁচু ও মাঝারি জমি আম চাষের জন্য উপযোগি।

জাত পরিচিতি
বারি আম-১ (মহানন্দা): প্রতি বছর নিয়মিত ফল দেয়। বাংলাদেশের সবখানেই এ জাতটির চাষ করা যায়। পাকা ফলের রং আকর্ষণীয় হলদে। ফলের ওজন গড়ে প্রায় ২০০ গ্রাম।

বারি আম-২: প্রতি বছর ফল ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন জাত। ফলের ওজন গড়ে ২৫০ গ্রাম। ফলের খোসা মধ্যম পুরু ও মসৃন। বাংলাদেশের সবখানেই এ জাতটির চাষ করা যায়।

বারি আম-৩ (আম্রপালি): প্রতি বছর নিয়মিত ফল দেয়। ফলের শাঁস গাঢ় কমলা রঙের। আঁশহীন, মধ্যম রসালো, শাঁস ফলের শতকরা ৭০ ভাগ। গাছের আকৃতি মাঝারি। প্রতি গাছে ফলের সংখ্যা ১৫৫-১৭০ টি।

বারি আম-৪ (হাইব্রিড আম): এটি একটি উচ্চ ফলনশীল, মিষ্টি স্বাদের নাব জাত। ফজলী আম শেষ হওয়ার পর এবং আশ্বিনা আমের সাথে এ জাতের আম পাকে। এ জাতের আম কাঁচা অবস্থাতেও খেতে মিষ্টি।

চারা তৈরি
ক্লেফট গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা তৈরি করা যায়।

চারা রোপণ
ষড়ভূজি পদ্ধতিতে আম চারা রোপণ করলে ১৫ ভাগ চারা বেশি রোপণ করা যায়। জৈষ্ঠ্য থেকে আষাঢ় (মধ্য মে থেকে মধ্য জুলাই) এবং ভাদ্র-আশ্বিন মাস (মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য অক্টোবর) চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। প্রতি গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৮ থেকে ১০ মিটার রাখতে হয়।

সার ব্যবস্থাপনা
প্রতি গর্তে সারের পরিমাণ গোবর ২২ কেজি, ইউরিয়া ১৫০ গ্রাম, টিএসপি সার ৫৫০ গ্রাম, এমওপি সার ৩০০ গ্রাম, জিপসাম সার ৩০০ গ্রাম, জিংক সালফেট সার ৬০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়। গর্ত ভর্তির ১০-১৫ দিন পর চারার গোড়ার মাটির বলসহ গর্তের মাঝখানে রোপণ করতে হবে।

একটি পূর্ণ বয়স্ক ফলন্ত আম গাছে বছরে ৫০ কেজি জৈব সার, ২ কেজি ইউরিয়া, ১ কেজি টিএসপি, ৫০০ গ্রাম এমওপি, ৫০০ গ্রাম জিপসাম ও ২৫ গ্রাম জিংক সালফেট প্রয়োগ করতে হবে। উল্লেখিত সার ২ কিসি-তে প্রয়োগ করতে হবে। প্রথমবার জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় মাসে এবং দ্বিতীয়বার আশ্বিন মাসে প্রয়োগ করতে হবে।

সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনা
ফলন্ত গাছে মুকুল বের হওয়ার ৩-৪ মাস আগ থেকে সেচ দেওয়া বন্ধ করতে হবে। তবে মুকুল ফোটার পর ও ফল মটর দানা হলে একবার বেসিন পদ্ধতিতে সেচ দেওয়া দরকার। গাছের গোড়া ও গাছের ডালপালা সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। কলমের গাছের বয়স ৪ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত মুকুল ভেঙে দিতে হবে।

রোগ ব্যবস্থাপনা
ক্ষতির নমুনা
গাছের পাতা, কান্ড, মুকুল ও পরে ধুসর বাদামি রঙের দাগ পড়ে। এ রোগে আক্রান- মুকুল ঝরে যায়, আমের গায়ে কালচে দাগ পড়ে এবং আম পচে যায়।

প্রতিকার
আমের মৌসুম শেষে গাছের মরা ডালপালা কেটে পুড়ে ফেলতে হয়। কাটা অংশে বোঁর্দো মিশ্রণ লাগাতে হয়। গাছে মুকুল আসার পর কিন’ ফুল ফোটার আগে ডাইথেন এম-৪৫ বা টিল্ট-২৫০ ইসি প্রয়োগ করা দরকার।

পোকা দমন ব্যবস্থাপনা
ক্ষতির নমুনা
ভোমরা পোকার কীড়া আমের গায়ে ছিদ্র করে ভিতরে ঢুকে শাঁস খায়। সাধারণত কচি আমে ছিদ্র করে এরা ভিতরে ঢুকে এবং ফল বড় হওয়ার সাথে সাথে ছিদ্রটি বন্ধ করে দেয় এ জন্য এ জন্য বাইরে থেকে আমটি ভাল মনে হলেও ভিতরে কীড়া পাওয়া যায়।

প্রতিকার
আম গাছের মরা ও অতিরিক্ত পাতা শাখা এবং পরগাছা কেটে ফেলতে হবে। গাছে ফল আসার ১-২ সপ্তাহ পর অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করা দরকার।

ফসল তোলা

আমের বোটা যখন হলুদাভ রঙ ধারণ করে তখন আম সংগ্রহ শুরু করতে হয়। গাছ ঝাকি না দিয়ে জালিযুক্ত বাঁশের কৌটার সাহায্যে আম সংগ্রহ করা ভালো।

আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে নওগাঁ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও নাটোর জেলাকে ছাড়িয়ে গেছে। ঠাঠা বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এক ফসলি জমিতে ধান চাষের চেয়ে আম চাষ লাভজনক। যে কারণে প্রতি বছর দুই হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আম বাগান গড়ে উঠছে। এঁটেল মাটির কারণে আম সুস্বাদু হওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। জেলায় চলতি বছরে প্রায় ৩শ’ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হবে। তবে ভরা মৌসুমে আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও পাইকারি বাজার গড়ে না তোলায় চাষিরা নায্য মূল্য পান না।

 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সূত্রমতে, এ বছর জেলায় ১৮ হাজার ৫২৭ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে। এর মধ্যে পোরশায় ৯ হাজার হেক্টর, সাপাহারে ৪ হাজার হেক্টর, নিয়ামতপুরে ৯৫০ হেক্টর, পত্নীতলায় ২ হাজার ২শ’ হেক্টর, ধামইরহাটে ৬১৫ হেক্টর, মান্দায় ৪শ’ হেক্টর, নওগাঁ সদরে ৪শ’ হেক্টর, মহাদেবপুরে ৩৬০ হেক্টর, বদলগাছীতে ৩৪০ হেক্টর, রানীনগরে ১৪৬ হেক্টর এবং আত্রাইয়ে ১১৬ হেক্টর।

এছর আমের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টন। নওগাঁর আম সুস্বাদু হওয়ায় গত দু’বছর ধরে বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। গত সাত বছর আগে জেলায় মাত্র ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হতো। জেলায় গুটি, ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষিরসাপতি, মোহনভোগ, আশ্বিনা, গোপালভোগ, হাঁড়িভাঙ্গা, আম্রপালি, বারি-৩, ৪ ও ১১, নাগফজলি, গৌড়মতি উন্নত জাতের আম চাষ হচ্ছে। এ ছাড়াও দেশীয় বিভিন্ন জাতের আম চাষ করা হয়ে থাকে।

 

 

 

জেলার সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা ও ধামইরহাট উপজেলার আংশিক বরেন্দ্র এলাকা হিসেবে খ্যাত। এলাকার জমিতে বছরের একটিমাত্র ফসল বৃষ্টিনির্ভর আমন ধান। পানি স্বল্পতার কারণে বছরের বেশির ভাগ সময় জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। এছাড়া ধানের আবাদে খরচও বেশি। অপরদিকে আম চাষে লাভ বেশি। ফলে ধান উৎপাদনের খরচ বেশি হওয়ায় কৃষকরা এখন আম চাষে ঝুঁকছেন। এতে প্রতি বছর প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে বাড়ছে আম বাগান। আম্রপালি, আশ্বিনা, ক্ষিরসাপতি, মল্লিকা, হাঁড়িভাঙ্গা, নাগফজলি ও ল্যাংড়াসহ কয়েক জাতের আম চাষ করা হচ্ছে।

 

 

আমচাষিরা বলেন, এ এলাকার আমকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বলে বিক্রি করা হয়ে থাকে। যখন আম পাকা শুরু হয়; তখন একসাথে বাজারে উঠতে শুরু করে। এ সুযোগে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে আমের দাম কমিয়ে দেয়। এতে চাষিরা দাম কম পায়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা লাভ ঠিকই পায়। চাষিরা ন্যায্য দাম পাওনা থেকে বঞ্চিত হন। মৌসুমে আমের দামের ব্যাপারে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন চাষিরা।

 

আমের বিশেষ জাতের মধ্যে ‘নাগফজলি’ উল্লেখযোগ্য। এটি বিশেষ করে পত্নীতলা, বদলগাছী, ধামইরহাট ও মহাদেবপুরে চাষ হয়ে থাকে। এ আম প্রথমে ১৪-১৫ বছর আগে বদলগাছীতে চাষ শুরু হলেও বর্তমানে পত্নীতলায় বেশি চাষ হয়ে থাকে। অন্য আমের তুলনায় নাগফজলি আম কম পচনশীল, খেতে সুস্বাদু ও বাজারে ব্যাপক চাহিদা। এ আমে ক্ষতিকর ফরমালিন ব্যবহারের প্রয়োজন না হওয়ায় উৎপাদন থেকে বাজারে নিতে খরচও কম হয়। এ আমের বাজার দিন দিন রাজধানী ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

পত্নীতলার নজিপুর মহল্লার ধরনীকান্ত ও শান্ত কুমার বলেন, পত্নীতলায় ১০-১২ বছর আগে কলম পদ্ধতির মাধ্যমে এ আম গাছ তৈরি করা হয়। বিভিন্ন কারণে চাষিরা দিন দিন নাগফজলি আমের চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। ইতোমধ্যে ছোট ছোট আমের বাগান গড়ে উঠেছে। সফল আমচাষিদের কাছ থেকে বাগান তৈরির পরামর্শ নিতে আসেন বিভিন্ন এলাকার চাষিরা।

 

 

পত্নীতলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা প্রকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, নাগফজলি আমের গুণাগুণের কারণে কৃষকরা আগ্রহী হয়ে উঠছেন। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকেও সহযোগিতা করা হয়। এ কারণে উপজেলায় প্রায় ৬শ’ হেক্টর জমিতে নাগফজলি আম চাষ করা হচ্ছে। আগামীতে এ আম চাষের পরিমাণ বাড়বে।

 

সাপাহার উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের তছলিম উদ্দীন জানান, তিনি গত বছরের শেষ দিকে ৭ একর জমির উপর আম বাগান গড়ে তুলেছেন। বাগানে প্রায় আড়াই হাজার আম গাছ রয়েছে। এর অধিকাংশ আম্রপালি জাতের। আগামী দুই বছর গাছগুলো থেকে আম সংগ্রহ করা হবে না। পরবর্তীতে আমের উৎপাদন বেড়ে যাবে।

 

সাপাহার পোস্ট অফিস পাড়ার গোলাপ খন্দকার জানান, প্রতি বছর ২ লাখ টাকা শর্তে ১০ বিঘা জমি ১২ বছরের জন্য ২৪ লাখ টাকা দিয়ে লীজ নিয়েছেন। সে জমিতে বারি-৪ জাতের আম লাগিয়েছেন। দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে আম সংগ্রহ শুরু হবে। ১২ বছরে এ জমি থেকে ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার আম বিক্রি হবে।

 

সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বলেন, এ উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান গড়ে উঠেছে। এই আম বাগানে শত শত বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

 

 

 

পোরশা উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের নুরুজ্জামান বলেন, এ অঞ্চলের মাটি এঁটেল হওয়ায় আম খুব সুস্বাদু। পোরশার আম রাজধানীসহ সারাদেশে রফতানি করা হয়ে থাকে। কোন প্রকার রাসায়নিক ছাড়াই আম বাজারজাত করা হয়।

 

পোরশা উপজেলা আম ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুস সামাদ শাহ্ বলেন, আমের ভালো দাম পেতে হলে সরকারের বিভিন্ন বিভাগকে এগিয়ে আসতে হবে। চলতি বছরে পোরশায় ৬০-৭৫ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হবে।

পোরশা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজ আলম বলেন, পোরশায় খরা মৌসুমে পানির অভাবে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি পতিত থাকে। ইতোমধ্যে উপজেলায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান গড়ে উঠেছে।

 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক রঞ্জিত কুমার মল্লিক বলেন, জেলায় প্রতি বছর শত শত টন আম উৎপাদন হলেও পাইকারি বাজার না থাকায় কম মূল্যে বিক্রি করে দেন আমচাষিরা। চাষিদের কৃষি বিভাগ থেকে সবসময় পরামর্শ দেওয়ায় চলতি বছর প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে। যেভাবে আম বাগান গড়ে উঠছে তাতে নওগাঁয় আম চাষে বিপ্লব ঘটতে চলেছে।

আমাদের দেশে দেশি আমের পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের বিদেশি আমের চাষ হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু উত্সাহী ব্যক্তি তাদের নিজস্ব বাগানে বিদেশি জাতের আমের চাষ করে সফল হয়েছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে ব্যাপকভিত্তিতে বিদেশি আমের চাষ হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আমের বাগানগুলোতে ভারত, পাকিস্তান, বার্মা, থাইল্যান্ডে, ভিয়েতনাম এবং শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের আমের চারা রোপণ করে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে। এখানে প্রায় ১৫/১৬ জাতের বিদেশি আম চাষ হচ্ছে। এসব বিদেশি আমের মধ্যে সম্প্রতি ভিয়েতনামের জনপ্রিয় আম রেডকিং নতুন চমক সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকা লামায় আম মেরিডিয়ান এগ্রো তাদের লামার পাহাড়ের বাগানের মধ্যে ভিয়েতনামের জনপ্রিয় রেডকিং আম পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করে সফল হয়। কর্তৃপক্ষ জানায় ২০১৪-১৫ সালের দিকে ভিয়েতনাম থেকে রেডকিং আমের চারা এনে রোপণ করার দুই বছর পর থেকে ফলন আসতে শুরু করে। বর্তমানে আমের মৌসুমে এসব আম গাছে প্রচুর ফলন আসছে। রেডকিং আমের আরেকটি নাম হবে মহাসেন। এই আমের বিশেষ বৈশিষ্ট হলো— দেখতে লাল রঙের সাথে বর্ণিল রঙের হয়ে থাকে। কাঁচা অবস্থায় লাল রঙের থাকে। পাকলে লাল এবং হলুদ বর্ণ ধারণ করে। রেডকিং আম খেতে বেশ সুস্বাদু এবং খুবই মিষ্টি। এর চামড়া খুব পাতলা হয়ে থাকে। এই আমে কোনো আঁশ থাকে না। আঁটি খুব পাতলা। মার্চ এপ্রিল মাসে আমের মুকুল আসে। জুন মাসে ফলন পাওয়া যায়। প্রতিটি আমের ওজন হয় ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম। প্রতিটি আম গাছ থেকে ৩০ থেকে ৪০ কেজি আম পাওয়া যায়। আমাদের দেশের মাটি এবং জলবায়ু রেডকিং জাতের আম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। তবে এই আম গাছের সুষ্ঠু পরিচর্যা ছাড়া ভালো ফলন আশা করা যায় না।

দেশের আড়াই শতাধিক জাতের আমের ভিড়ে নিজের অনন্য অবস্থানকে জানান দিচ্ছে সম্প্রতি উদ্ভাবিত গৌরমতি। আর মিষ্টতার মাত্রা ২৭ টিএসএস নিয়ে সবচে’ মিষ্টি আমের বৈশিষ্ট্য বহন করছে গৌরমতি। অন্য সব গাছের আম যখন শেষ, তখন এ সেপ্টেম্বরে শুরু হয়েছে গৌরমতির মৌসুম। নতুন উদ্ভাবিত এ আমের বাণিজ্যিক চাষে সফল হয়েছেন নাটোরের আদর্শ ফল উৎ পাদক গোলাম মওলা।বাসস

২০১২ সালে এ জাতের আম উদ্ভাবনের পরের বছরে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগরের খামারে মাত্র আটটি চারা দিয়ে গৌরমতির চাষ শুরু করেন গোলাম মওলা। প্রথমবার চার মণ ফলন পান। সেপ্টেম্বরে আমের অফসিজন হওয়ায় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেন পাঁচশত টাকা কেজি দরে। বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় গোলাম মওলা তৎপর হন পরিধি বাড়াতে। জেলার মধ্যে সবচে’ বড় পরিসরে গৌরমতির বাগান করেছেন তিনি। ২৪ বিঘার গৌরমতির বাগানে দুই হাজার গাছ আছে। এগুলোর মধ্যে চলতি মৌসুমে একশ’ গাছে আম ধরেছে। বর্তমানে চলছে বিপণন কার্যক্রম।

স্থানীয় বাজারের গন্ডি পেরিয়ে গোলাম মওলার খামারের আম পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। স্মারক শুভেচ্ছা হিসেবে গেছে প্রধানমন্ত্রী ও কৃষি মন্ত্রীর দপ্তরে। অসময়ের আম হওয়ায় চাহিদার ব্যাপকতার কারণে বিপণন কার্যক্রমের জন্যে কোথাও যেতে হয়নি তাকে। আগ্রহীরা বাগানে এসেই কৌতুহল ভরে আমের ফলন দেখছেন আর কিনছেন আম।

নাটোরের সফল ফল চাষী কলেজ শিক্ষক গোলাম মওলার জামনগরের খামার রকমারী ফলের গাছে সমৃদ্ধ। বলা চলে, জার্মপ্লাজম সেন্টার। তবে বর্তমানে খামারের সবচে’ বড় আকর্ষণ গৌরমতি আম গাছ। এ গাছের পাতা ল্যাংড়া আম গাছের মত । খামারকে সুশোভিত করে রেখেছে আমের ভারে নুব্জ হয়ে পড়া আম গাছগুলো। সুডৌল আমগুলোর সৌন্দর্য নজরকাড়া। এক একটির গড় ওজন সাতশ’ গ্রাম।

গোলাম মওলা আমকে কীটনাশকমুক্ত এবং সম্পূর্ণর্র্ অর্গানিক রাখতে শুধু ব্যাগিং নয় নেট দিয়ে আমের গাছগুলোকে ঘিরেও রেখেছেন। ফল উৎপাদকদের জন্যে এটি একটি দৃষ্টান্ত বলে কৃষিবিদরা মনে করেন।

গৌরমতির পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজনে খামারে চারা উৎপাদন করলেও আগ্রহীদের কাছে বিক্রি করছেন দুই থেকে তিনশ’ টাকা দরে। বাণিজ্যিকভাবে চারা উৎপাদনের মাধ্যমে আগ্রহী ফল চাষীদের মাধ্যমে গৌরমতির বিস্তার ঘটানোর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানালেন গোলাম মওলা।

বাগাতিপাড়া উপজেলা কৃষি অফিসার মোমরেজ আলী বলেন, শুধু উপজেলা জেলা নয় নাটোর জেলায় গৌরমতির চাষে অনন্য অবদান রেখেছেন গোলাম মওলা। তাঁর এ অবদান গৌরবের।

বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের জাতীয় পরামর্শক এস এম কামরুজ্জামান এবং প্রকল্প পরিচালক মেহেদী মাসুদ সম্প্রতি গোলাম মওলার গৌরমতির খামার পরিদর্শন করেছেন।

গৌরমতি আমের উদ্ভাবন সম্পর্কে বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের জাতীয় পরামর্শক এবং মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ফল বিজ্ঞানী এস এস কামরুজ্জামান বলেন, ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টার থেকে তৎকালীন কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে কিছু আম পাঠানো হয়। অজ্ঞাত জাতের এ আম খেয়ে মুগ্ধতার কথা কৃষি মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে জানতে পারে উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক। প্রকল্পের নির্দেশনায় সংগৃহিত আমের গাছ সনাক্ত করা হয়-চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনা মসজিদ এলাকার শিয়ালমারা এলাকায়। জাহাঙ্গির মাষ্টারের আশ্বিণা আম বাগান থেকে সংগৃহিত ঐ গাছে তখনো কয়েকটি আম রয়ে গেছে। সংগ্রহ করা হলো আটটি আম, শুরু হলো প্রকল্পের পক্ষ থেকে এ গাছের চারা উৎপাদন কার্যক্রম। পরের বছর মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের পক্ষ থেকে ঐ গাছের সব আম কিনে নেয়া হলো আর আম ধরা গাছের নীচে দেশের ৬০টি হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদদের নিয়ে বসলো বৈঠক। বৈঠক শেষে এ গাছের আমের চারা তৈরীর জন্যে সবার হাতে তুলে দেয়া হলো গাছের সায়ন (কলম করার উপযোগী গাছের কচি ডগা)। এরপর থেকে সকল হর্টিকালচার সেন্টারে তৈরী হতে শুরু করে এ গাছের চারা। এখন এসব চারা ফল দিতে শুরু করেছে।

এ আমের নামকরণ সম্পর্কে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসর গহ্রণকারী ফল গবেষক এস এম কামরুজ্জামান বলেন, প্রাচীন বাংলার গৌর এলাকায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের অবস্থান হওয়ায় গৌর শব্দটি এসেছে আর মতি হচ্ছে মহামূল্যবান- এ দু’য়ের সমন্বয়ে উদ্যানতত্ত্ববিদদের ঐ বৈঠকে আমার প্রস্তাবনায় নামকরণ করা হলো গৌরমতি।

বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মেহেদী মাসুদ বাসস’কে বলেন, নিরাপদ গৌরমতি আমের ফলনে গোলাম মওলা অনন্য অবদান রেখেছেন। ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় এ আমের দেশব্যাপী প্রসার ঘটাতে প্রকল্পের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার দুল্লা ইউনিয়নের বিন্নাকুড়ী গ্রামে বারি-৪ জাতের আম চাষে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন কলেজ শিক্ষক বকুল হোসেন। তাঁর এমন সফলতা দেখে এলাকার অনেক শিক্ষিত বেকার যুবক এখন এ আম চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। স্থানীয় কৃষি বিভাগ আম চাষীদেরকে প্রয়োজনীয় কারিগরী সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।

 

ছোট ছোট গাছে থোকা থোকা আম ঝুলছে প্রতিটি গাছে। ১ একর জমির উপর ২’ শ ৯০টি বারি-৪ জাতের আমের চারা রোপণ করে বিশাল বাগান গড়েছেন কলেজ শিক্ষক বকুল হোসেন। এ জাতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অন্যান্য আমের মৌসুম শেষ হলে এটি খাওয়ার উপযোগী হয়। চলতি বছর ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম চাষ করায় তার বাগানে আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। গেলো বছর এ বাগান থেকে তিন লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন তিনি। এ বছর ৬ লাখ টাকার আম বিক্রি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কীটনাশক ছাড়া অর্গানিক পদ্ধতিতে এ জাতের আম উৎপাদনে ব্যাপক সফলতা পাবার কথা জানালেন- আমচাষী বকুল হোসেন।

আর আম বাগানে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় শ্রমিকরা। এদিকে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকায় এ জাতের আমের প্রদর্শণী দিয়ে সবধরনের কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেয়ার কথা জানালেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা

চেষ্টার কোনও বিকল্প নেই। এই সার সত্যটিই এবার বাস্তবে রূপায়িত করল আসানসোলের সালানপুর ব্লক প্রশাসন। রাজ্যে বর্ষা প্রায় গরহাজির হওয়ায় জলের আকাল দেখা দিয়েছিল পশ্চিমভাগের অঞ্চলগুলিতে। কিন্তু তাতে থেমে থাকার পাত্র নয় সালানপুর ব্লক প্রশসান। জলের যোগান কম তো কী, মাটিতে হাঁড়ি বসিয়ে জল ঢেলে সেচের ব্যবস্থা করে সফলভাবে আম চাষ করে দেখাল সালানপুর। এমন অচিরাচরিত পদ্ধতিতে চাষ করে রিতীমতো নজির গড়ল বর্দ্ধমান জেলার এই ব্লক।

 

ঠিক কী পদ্ধতিতে হচ্ছে চাষ?

 

আল্লাডি গ্রাম পঞ্চায়েতের রামচন্দ্রপুর এলাকার অবিনব উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সালানপুর ব্লক প্রশাসন। তাঁদের সহায়তা নিয়েই গ্রামে অভিনব পদ্ধতিতে শুরু করা হল আম চাষ। এমনিতেই খরাপ্রবণ এলাকা এই সালানপুর ব্লক। এর উপর দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় চাষাবাদও সেভাবে হয় না এখানে। তবে প্রতিবছরই আমের মরসুম ফলনের দিক থেকে জমজমাট থাকে সালানপুর। কিন্তু এ বছরের বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কারণে সেই ফলনেও বিপর্যয় নেমে আসে। আম গাছ বাঁচাতে তাই গাছের পাশে বসানো হয়েছে একটি করে মাটির হাঁড়ি। সেখানে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে জল। সেই জল দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী থেকে আসতে আসতে আম গাছের গোড়ায় জল সরবরাহ করছে। এর ফলে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে আম গাছগুলি।

 

এমন অভিনব পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে গাছগুলির বৃদ্ধিতে কোনওরকম সমস্যা দেখা দিচ্ছে না বলেই খবর। বর্তমানে প্রায় ৩০০টি আমগাছ লাগিয়ে এই পদ্ধতিতেই আম চাষ করা হচ্ছে সেখানে। সালানপুর ব্লকের বিডিও তপন সরকার বলেন, “এই অভিনব পদ্ধতিতে আম চাষের ফলে অভাবনীয় সাফল্যও মিলেছে। আগামী দিনে আরও বেশ কিছু এলাকায় এই ধরনের চাষের পরিকল্পনা রয়েছে”।

 

 

সালানপুরের রামচন্দ্রপুর এলাকার এই ‘আজব সেচে’র দ্বারা আম ফলনে অবাক গোটা জেলা। প্রসঙ্গত, এবারে রাজ্যে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম হওয়ায় বহু জায়গাতেই আমের ফলনের ক্ষেত্রে বেশ সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। গত বছরের থেকে কম হয়েছে আমের ফলনও। তবে সালানপুরের এই অভিনব উদ্যোগ যে ভবিষ্যতে চাষের ক্ষেত্রে নয়া দিশা দেখাতে পারে, এমনটাই মনে করছেন সালানপুরবাসীরা।

আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জকে পিছনে ফেলে নতুন রাজধানী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে নওগাঁ। দেশের মোট উৎপাদিত আমের সিংহভাগই আসে নওগাঁ থেকে যা এতোদিন ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের দখলে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সারাদেশে মোট আমের উৎপাদন ছিলো প্রায় ২৩ লাখ ৭২ হাজার টনের কিছু বেশি। এর মধ্য নওগাঁ থেকে আসে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪৮৬ টন আম। যেখানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসেছে ২ লাখ ৭৫ হাজার টন এবং রাজশাহী থেকে এসেছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪২৬ টন। অথচ ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও নওগাঁতে আমের মোট উৎপাদন ছিলো ১ লাখ ৬১ হাজার ৯১০ টন। সে বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপন্ন হয়েছে ২ লাখ ৪৪ হাজার টন আর রাজশাহী থেকে এসেছে ২ লাখ ৮ হাজার ৬৬৪ টন আম।

নওগাঁর ঠাঠা হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলের এক ফসলি জমিতে ধান চাষের চেয়ে আম চাষ লাভজনক। আর এ কারণেই প্রতি বছর দুই হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আম বাগান গড়ে উঠছে। মাটির বৈশিষ্ট্যগত (এঁটেল মাটি) কারণে নওগাঁর আম সুস্বাদু হওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে আমের ভরা মৌসুমে আম সংরক্ষণের ব্যবস্থা ও পাইকারি বাজার গড়ে না তোলায় আম চাষিরা নায্য মূল্য পান না। জেলায় আগামিতে আরো অধিক আম উৎপাদন করার লক্ষে আম গবেষণা কেন্দ্র, পাইকারি বাজার ও সংরক্ষাণাগার গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত সাত বছরের যেখানে নওগাঁয় মাত্র ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান ছিল। সেখানে বর্তমানে জেলায় প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান গড়ে উঠেছে। স্থানীয় ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এক ফসলি জমিতে ধানসহ অন্যান্যে ফসল চাষের চেয়ে আম চাষে লাভজনক হওয়ায় আগামীতে নওগাঁয় আম চাষে বিপ্লব ঘটতে চলেছে। জেলায় গুটি, ল্যাংরা, ফজলি, ক্ষিরসাপতি, মোহনভোগ, আশ্বিনা, গোপালভোগ, হাঁড়িভাঙ্গা, আম্রপালি, বারি-৩, ৪ ও ১১, নাগফজলি, গৌড়মতি উন্নত জাতের আম চাষ হচ্ছে। এ ছাড়াও দেশীয় বিভিন্ন জাতের আম চাষ করা হয়ে থাকে। এ সকল আমের বিশেষ জাতের মধ্যে আম ‘নাগফজলি’। এই নাগফজলি বিশেষ করে পত্নীতলা, বদলগাছী, ধামইরহাট ও মহাদেবপুরে চাষ হয়ে থাকে। এই আম প্রথমে ১৪/১৫ বছর আগে বদলগাছীতে চাষ শুরু হলেও বর্তমানে পত্নীতলায় বেশি চাষ হয়ে থাকে।

জানা গেছে, অন্য আমের তুলনায় নাগফজলি আম কম পচনশীল, খেতে সুস্বাদু, ও বাজারে ব্যাপক চাহিদা এ আমে ক্ষতিকারক ফরমালিন ব্যবহার করার প্রয়োজন না হওয়ায় উৎপাদন থেকে বাজার করতে খরচও কম লাগে। এই আমের বাজার দিন দিন রাজধানি ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে।

পত্নীতলার জামগ্রামের নুরুজ্জামান জানান, নাগ ফজলি পত্নীতলায় ১০ থেকে ১২ বছর আগে কলম পদ্ধতির মাধ্যমে এই নাগ ফজলি আম গাছ তৈরি করা হয়। খেতে সুস্বাদু, আঁশ কম, অন্য আমের তুলনায় কম পচনশীল ও বাজারে চাহিদা থাকায় ও মাটির শুণাগুনের কারণে পত্নীতলায় আম চাষিরা দিনদিন নাগ ফজলি আমের চাষ ঝুঁকে পরেছে। ইত্যেমধ্যে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এখানে ছোট ছোট নাগ ফজলি আমের বাগান গড়ে উঠেছে। এ আম চাষে ঝুঁকি কম ও লাভ বেশি হওয়ায় অনেক সফল আম চাষিদের কাছ থেকে বাগান তৈরীর পরামর্শ নিতে আসেন অনেক এলাকার আম চাষি।

এদিকে রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাত বছর আগে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান ছিল। বর্তমানে প্রায় ২৮ হাজার ৮শ’ ২০ হেক্টর জমিতে আগ বাগান গড়ে উঠেছে। রাজশাহীতে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে আম বাগান ছিল সাত বছর আগে। বর্তমানে প্রায় ১৭ হাজার ৪শ’ ৬৩ হেক্টর জমিতে আম বাগান গড়ে উঠেছে। আর নাটোর জেলায় বর্তমানে মাত্র ৪ হাজার ৮শ’ ২৩শ’ হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হচ্ছে।  

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ সূত্রে জানা গেছে, নওগাঁর পোরশা, সাপাহার, বদলগাছী, পত্নীতলা, মান্দা, ধামইরহাট, নিয়ামতপুর ঠাঠা বরেন্দ্র ভূমী হিসেবে পরিচিত। এ অঞ্চলে পানির স্তর মাটির অনেক নিচে হওয়ায় বছরের বেশি সময় ধরে জমি পতিত থাকে। আমন ধান ছাড়া ইরি-বোরো ধান চাষ হয় না। বর্ষ মৌসুমে ঠাঠা এ অঞ্চলের অধিকাংশ জমিতে শুধু মাত্র আমন ধান চাষ হয়ে থাকে। ধানের চেয়ে আম চাষে বেশি লাভ নওগাঁর ১১টি উপজেলার মধ্যে ঠাঠা বরেন্দ্রভূমির এ সব অঞ্চলে দিনদিন শতশত বিঘা জমিতে উন্নত (হাইব্রিড) জাতের আম বাগান গড়ে উঠছে। গত সাত বছর আগে জেলা মাত্র ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হতো। এ বছর জেলায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে। নওগাঁর আম সুস্বাদু হওয়ায় গত দু’বছর থেকে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
 
পোরশা উপজেলার নীতপুর বাজার এলাকার বাঙ্গালপাড়ার আমির উদ্দিন জানান, জমিতে আমের বাগানে সরিষা, ডাল, গম, ধান চাষ করায় কৃষকরা এক বিঘা জমিতে বছরে লক্ষাধিক টাকা আয় করে থাকেন। ধানসহ অন্যন্যে ফসল চাষ করে যে লাভ হয় তার চেয়ে কয়েকগুণ লাভ বেশি হয় আম চাষে। এ জন্যেই এলাকার কৃষকরা আম বাগানে কৃষকরা ঝুঁকে পরেছে।
পোরশা উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের নুরুজ্জামান জানান, আগে জেলায় ল্যাংরা, ফজলি, ক্ষিরসাপতি, মোহনভোগ, আশ্বিনা, গোপালভোগ জাতের আম চাষ করতেন এলাকাবাসি। তবে বর্তমানে উন্নত জাতের আম্রপালি, বারি-৩, ৪ ও ১১ জাতের আম চাষ করা হচ্ছে। সাধারণ জাতের চেয়ে আম্রপালি ও বারি-৪ জাতের আম দ্বিগুণ উৎপাদন ও দাম বেশি পাওয়ায় উন্নত জাতের এ আম চাষে ঝুঁকে পরেছেন। এক বিঘা জমি থেকে ধান চাষে বছর আয় হয় মাত্র ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। অথচ তিন-চার বছরের একটি আম বাগান থেকে প্রতি বছর ৪০ হাজার টাকা থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় হয় এক বিঘা জামিতে। বছর যায় আম উৎপাদন বেশি হয়। ফলে টাকার পরিমাণও বৃদ্ধি হয়।

বদলগাছী হর্টিকালচারের উদ্যান কর্মকর্তা (এলআর) আ.ন.ম আনারুল হাসান জানান, বছর ব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পে আওয়াতায় এখানে উন্নত জাতের আম গাছ সংগ্রহ ও বিক্রি করা হচ্ছে। চলতি অর্থ বছরে প্রায় আড়াই হাজার উন্নত জাতের আম গাছ বিক্রি হয়েছে। এই উন্নত আম জাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে নতুন জাতের ‘গৌড়মতি’ আমের। ‘গৌড়মতি’ ব্যাপক চাহিদা থাকলেও আম চাষিদের মধ্যে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আগামিতে এর ‘মা’ গাছ তৈরী ও কলমের মাধ্যমে আরো গাছ তৈরী করে কৃষকদের মাঝে সরবরাহ করা হবে। এই উদ্যানে চলতি বছরে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) আ. জা. মু. আহসান শহীদ সরকার জানান, জেলায় ইরি-বোরো ধানের প্রতি বিঘায় মাত্র ২০ মণ থেকে ২৪ মণ ধান ও আমন ধান ১০ মণ থেকে ১৪ মণ ধান উৎপাদন হয়ে থাকে। খরচ বাদ দিয়ে ধান চাষিদের তেমন লাভ থাকে না। অথচ এক বিঘা জমিতে ৩০টি আম গাছ লাগানো যায়। আম গাছ লাগানোর ৪-৫ বছরের পর প্রতি গাছ থেকে দেড় মণ থেকে দুই মণ আম পাওয়া যায়। এর ফলে প্রতি বিঘা থেকে আম বিক্রি হয় ৪০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা। তিনি আরো জানান, পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুর বর্ষ মৌসুমে আমন ধান চাষ করার পর পানির অভাবে প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে আর কোন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। সরকারের নির্দেশ রয়েছে ভূগর্ভস্থ পানি কম ব্যবহার করে স্বল্প সেচ চাহিদা সম্পন্ন ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুত্ত করা। ধান চাষে অধিক পানি লাগায় স্বল্প সেচ চাহিদা সম্পন্ন আম চাষে কৃষকদের উদ্বুত্ত করা হচ্ছে।  

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রঞ্জিত কুমার মল্লিক জানান, জেলায় প্রতি বছর শত শত টন আম উৎপাদন হলেও পাইকারি বাজার না থাকায় দ্রুত আম কম মূল্যে বিক্রি করে দেন আম চাষিরা। গত পাঁচ/ছয় বছর আগে জেলা মাত্র ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হতো। আম চাষিদের কৃষি বিভাগ থেকে সব সময় পরামর্শ দেয়ায় চলতি বছর জেলায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ করা হয়েছে। প্রতি বছর গড়ে ২ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে আম বাগান গড়ে উঠছে। নওগাঁর আম সুস্বাদু হওয়ায় গত দু’বছর থেকে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মনিটরিং ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা আহসান হাবিব খাঁন জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোর জেলার মধ্যে নওগাঁয় আমের যে ভাবে বাগান গড়ে উঠছে তা বলাবাহুল্য। মাটির কারণে স্বাদেগুণে নওগাঁর বিশেষ করে পোরশার আমের তুলনা চলে না। বর্ষা মৌসুম ছাড়া আর কোন সময় ফসল হয় না এমন জমিকে এক ফসলি জমি বলা হয়ে থাকে। এক ফসলি রয়েছে এমন উপজেলা নওগাঁর পোরশা, সাপাহার ও নিয়ামতপুরে সরকারের নির্দেশে স্বল্প সেচ চাহিদা সম্পন্ন ফসল উৎপাদন করা। এর মধ্যে সবচেয়ে আম চাষে লাভ হওয়ায় কৃষকদের আম চাষে উদ্বুত্ত করা হচ্ছে।  

তিনি আশা করছেন, এক ফসলি জমিতে আম চাষ করার ফলে কৃষকরা বেশি লাভবান হবেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, ও নাটোর জেলার চেয়ে নওগাঁয় বছরে যেভাবে আম বাগান গড়ে উঠছে তাতে নওগাঁয় আম চাষে বিপ্লব ঘটতে চলছে।

ছাদ বাগানের প্রথম শর্ত হচ্ছে, গাছ বাছাই. জেনে, বুঝে, বিশ্বস্ত নার্সারির কাছ থেকে গাছ সংগ্রহ করতে হবে। প্রথমত ছাদে বাগান করার সময় লক্ষ রাখতে হবে যেন গাছটি বড় আকারের না হয় অর্থাৎ ছোট আকারের জাতের গাছ লাগাতে হবে এবং গাছে যেন বেশি ফল ধরে সে জন্য হাইব্রিড জাতের ফলদ গাছ লাগানো যেতে পারে যেমন আম্রপালি ও মলি্লকা জাতের আম, পেয়ারা, আপেল কুল, জলপাই, করমচা, শরিফা, আতা, আমড়া, লেবু, ডালিম, পেঁপে। বেঁটে প্রজাতির অতিদ্রুত বর্ধনশীল ও ফল প্রদানকারী গাছই ছাদ বাগানের জন্য উত্তম। ছাদ বাগান এর ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে বীজের চারা নয়, কলমের চারা লাগালে অতিদ্রুত ফল পাওয়া যায়. আজকাল বিভিন্ন ফলের গুটি কলম, চোখ কলম ও জোড় কলম পাওয়া যাচ্ছে। ছাদ বাগানের জন্য এসব কলমের চারা সংগ্রহ করতে পারলে ভালো হয়। টবে আমের মধ্যে আম্রপালি, আলফানসো আম, কাটিমন থাই বারমাসি আম বেঁটে প্রজাতির বারোমেসে, লতা, ফিলিপাইনের সুপার সুইট, রাঙ্গু আই চাষ করা যেতে পারে। লেবুর মধ্যে কাগজিলেবু, নাগপুরী কমলা,মালবেরী চারা, মাল্টা বারি-১, মালটা, নারকেলি লেবু, চায়না কমলা টবে খুবই ভালো হয়। চেরী ফল চারা (ইন্ডিয়ান), ছফেদা,থাই কালো আঙ্গুর, সাদা আংগুর, লাল আংগুর, থাই জাম্বুরা , এ ছাড়া কলমের জলপাই, থাইল্যান্ডের মিষ্টি জলপাই, কলমের শরিফা, কলমের কদবেল,পাকিস্তানী আনার, ডালিম, স্ট্রবেরি, বাউকুল, আপেলকুল, নারিকেলকুল, লিচু, থাইল্যান্ডের লাল জামরুল, গ্রিন ড্রপ জামরুল, আপেল জামরুল, আঙ্গুর পেয়ারা, থাই পেয়ারা, ফলসা, খুদে জাম, আঁশফল , জোড় কলমের কামরাঙা, এমনকি রাম্বুটান কলম চারা (মালেশিয়ান লিচু),লিচু চায়না -৩, লংগান (কাঠলিচু) , চাষ করা যেতে পারে। সঠিক মানের চারা হলে এক বছরের মধ্যেই ফল আসে. আজকাল বিদেশ থেকে উন্নত মানের কিছু চারা কলম দেশে আসছে। ছাদ বাগানের সাধ পূরণ করার জন্য এসব সংগ্রহ করে লাগাতে পারেন। বাহারি পাতার জামরুল, পেয়ারা, সফেদা গাছও বিভিন্ন নার্সারিতে এখন কিনতে পাওয়া যাচ্ছে. ছাদে এসব গাছ লাগানো হলে ছাদ বাগানের সৌন্দার্য বৃদ্ধি পায়।
ছাদ বাগান করার নিয়ম

ছাদ বাগান
ছাদ বাগান এ টব এ গাছ লাগানো পদ্ধতি:
ছাদে টবে গাছ লাগানো অনেকেই পছন্দ করেন এ পদ্ধতিতে আপনার প্রয়োজন মতো সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টব গুলো সরানো যায়। টবে সার-মাটি দেওয়া খুব সহজ।আজকাল অনেকেই পোড়ামাটি এবং প্লাস্টিকের টব ব্যবহার করেন। আবার টবের গায়ে রং দিয়ে সৌন্দর্য বাড়ানো যায়। টবে গাছ লাগানোর সময় মনে রাখতে হবে যেন ওই গাছ বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টবের অল্প মাটিতেই ওই গাছের খাদ্যপুষ্টি থাকে।
ছাদ বাগান এ হাফ ড্রাম এ গাছ লাগানো পদ্ধতি:
এ পদ্ধতি তে একটি বড় আকারের ড্রামের মাঝামাঝি কেটে দুই টুকরো করে বড় দুটি টব তৈরি করা যায়। বড় জাতের এবং ফলের গাছের জন্য হাফ ড্রাম পদ্ধতি ভালো। ড্রাম গুলো সরাসরি ছাদের ওপর না বসিয়ে কয়েকটি টুকরো ইটের ওপর বসানো দরকার। অনেকে মনে করেন, ছাদের ওপর হাফ ড্রাম রাখলে ছাদের ক্ষতি হয় এ ধারণা সঠিক নয়।
ছাদ বাগান এ স্থায়ী বেড পদ্ধতি এ গাছ লাগানো পদ্ধতি :
ছাদের কোনো অংশে স্থায়ী বাগান করতে চাইলে সুবিধামতো আকারের স্থায়ী বেড তৈরি করা যায়. তবে চার ফুট দৈর্ঘ্য, চার ফুট প্রস্থ এবং দুই ফুট উচ্চতার বেড তৈরি করা ভালো. এ ধরনের বেড তৈরি করতে নিচে পুরু পলিথিন দিয়ে ঢালাই করলে ছাদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
ছাদ বাগান এর টবের প্রস্তুত পদ্ধতি :
ফুল কিংবা ফল গাছ যাই হোক না কেন, টব ব্যবহার করার সময় লক্ষ রাখতে হবে, গাছের আকার কত বড় হবে। সেই মতো টবের আকার নির্ধারণ করা দরকার। পানি গড়িয়ে যাওয়ার জন্য টবের নিচে ছিদ্র থাকতে হবে, ইটের টুকরো দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। চারা কেনার সময় অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের চারা সংগ্রহ করা দরকার। যে গাছের চারা লাগানো হবে তা সাধারণ পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। এর ফলে রোগের সংক্রমণ অনেক কমে যায়। গাছ বড় হলে প্রয়োজনে বড় টবে সাবধানে চারা স্থানান্তর করে নেওয়া যায়। তবে টব ভেঙে চারা গাছ বের করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, চারা গাছটি যেন কোনোভাবেই আঘাত না পায়।
ছাদ বাগান এর সার ও মাটির পরিমান :
টবের গাছের খাদ্য পুষ্টি চাহিদা মেটানোর জন্য মাটিতে দরকারি সার মেশাতে হবে। মাটি, গোবর সার, কম্পোস্ট, পচা পাতা, পরিমাণমতো রাসায়নিক সার মেশাতে হবে। শুকনো দূর্বা ঘাস টবের মাটির মাঝামাঝি দিয়ে তার ওপরে মাটি দিয়ে চারা গাছ লাগানো ভালো।
ছাদ বাগান এর সেবা ও যত্ম  :
যেহেতু ছাদ বাগান সীমিত আকারে ও সীমিত জায়গায় উৎপাদন করা হয় সেজন্য অতিরিক্ত যত্ম সেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি. কেননা সার কমবেশি হলে, গাছের গায়ে লেগে গেলে গাছ মরে যাবে, পরিমাণ মতো না হলে অপুষ্টিতে ভুগবে ।
টবের ক্ষেত্রে ছোট গাছ বড় হলে পট / টব বদল, পুরানো টবকে আলতো করে মাটিতে শুইয়ে গড়াগড়ি দিলে গাছটি টব থেকে বেড়িয়ে আসবে।পরে অতিরিক্ত মূল কেটে মাটি বদলিয়ে সার প্রয়োগসহ নতুনভাবে গাছ বসাতে হবে সময়মতো। বছরে অন্তত একবার পুরাতন মাটি বদলিয়ে নতুন মাটি জৈব সারসহ দিতে হবে। বর্তমানে বাজারে টবের মাটি কিনতে পাওয়া যায়। মানসম্মত মাটি কিনে টবে / পটে / ড্রামে ভরতে হবে।
ছাদ বাগান এ খুব সাবধানতার সাথে টব / পটে / ড্রামে চারা / কলম / বীজ লাগাতে হবে। ঠিক মাঝখানে পরিমাণ মতো মাটির নিচে রোপন করতে হবে। চারা বা কলমের সাথে লাগানো মাটির বল যেন না ভাঙ্গে সেদিকে নজর রাখতে হবে। চারা বা কলমের ক্ষেত্রে বীজতলা / নার্সারিতে যতটুকু নিচে বা মাটির সমানে ছিল ততটুকু সমানে ছাদে লাগাতে হবে। বীজতলার থেকে বেশি বা কম গভীরে লাগালে গাছের বাড়বাড়তিতে সমস্যা হবে। মাঠে ফলমুল সবজি চাষের চেয়ে ছাদে সবজি চাষের অনেক পার্থক্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। বাগানে প্রতিদিন পরিষ্কার কার্যক্রম অনুসরণ করতে হবে. সেজন্য পুরাতন রোগাক্রান্ত, বয়স্ক ডালপালা, পাতা সাবধানতার সাথে কেটে নির্দিষ্ট স্থানে জমা করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। এতে গাছপালা রোগমুক্ত থাকবে ফলনে সুবিধা হবে। ফুল এবং সবজিতে প্রয়োজন মাফিক সার প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু ফলের ক্ষেত্রে অন্তত দু’বার বর্ষার আগে ও বর্ষার পরে পরিমাণমত সার দিতে হবে। সার প্রয়োগের সময় মাটির আর্দ্রতা দেখে নিতে হবে। কেননা বেশি আর্দ্র বা কম আর্দ্র কোন টাইপের সার প্রয়োগের জন্য উপযুক্ত নয়। বিশেষ ক্ষেত্রে কিছু কিছু সার পানিতে মিশিয়ে গাছ ছিটিয়ে দিতে হবে। গুঁটি সারও এ ক্ষেত্রে বিশেষ উপযোগী।

Page 1 of 35